কুকুরকে পোষ্য হিসেবে ঘরে আনার পর তার যত্নে খাবার, চিকিৎসা ও পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো প্রশিক্ষণ। শুধু আদর-যত্ন করলেই একটি কুকুর পরিবারের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেবে, এমনটা নয়। ঘরের নিয়ম মেনে চলা, নির্দিষ্ট জায়গায় টয়লেট করা, বাইরে হাঁটার সময় নিয়ন্ত্রণে থাকা, অতিথি এলে অতিরিক্ত উত্তেজিত না হওয়া কিংবা অকারণে ঘেউ ঘেউ না করা, এসব আচরণ শেখাতে প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ।
বিষয়টি নিয়ে দেশের অন্যতম ডগ ট্রেনার শাহ আলম বলেন, প্রতিটি কুকুরের আচরণ ও শেখার ধরন আলাদা। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই কুকুরটির বয়স, প্রজাতি, স্বভাব, পূর্বের অভিজ্ঞতা এবং আচরণগত ধরন পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। এসব বিষয় বুঝে তার প্রয়োজন অনুযায়ী একটি প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। সাধারণত অনুগত হওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বসা, স্থির থাকা, কাছে আসা, পাশে চলা, অপেক্ষা করা, লিশ বা দড়ি ধরে হাঁটা ও শৌচকর্মের প্রশিক্ষণ। প্রথমদিকে ছোট ছোট ধাপে এসব কমান্ড শেখানো হয়। কুকুর সঠিকভাবে নির্দেশ পালন করলে তাকে প্রশংসা, খাবার বা উপযুক্ত পুরস্কার দেওয়া হয়। এতে কুকুর বুঝতে শেখে কোন আচরণের জন্য সে উৎসাহ পাচ্ছে।
তবে সব কুকুরের সমস্যা একই রকম নয়। কোনো কুকুর অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করতে পারে, কেউ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, কেউ কামড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। আবার আক্রমণ, ভয়, একা থাকলে অস্থির হয়ে পড়া বা ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট করার মতো সমস্যাও দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে শুধু আদেশ শেখানো যথেষ্ট নয়। সমস্যার কারণ বোঝার পর ধীরে ধীরে আচরণের পরিবর্তনের দিকে যেতে হয়।
কুকুর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অনেক মালিক দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় বকাঝকা বা শাস্তির পথ বেছে নেন। কিন্তু এতে অনেক সময় কুকুরের ভয় বা অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। বরং কোন আচরণের পেছনে কী কারণ রয়েছে, সেটি বোঝা জরুরি।
কুকুর প্রশিক্ষণের সময় আক্রমণাত্মক আচরণ, ভয়, অতিরিক্ত ঘেউ ঘেউ করা, ধ্বংসাত্মক আচরণ এবং সামাজিকীকরণের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটি কুকুরের স্বভাব ও শেখার ক্ষমতা আলাদা হওয়ায় কেউ দ্রুত আদেশ শিখে ফেলে, আবার কারও ক্ষেত্রে বেশি সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়।
শাহ আলম আরও বলেন, অনেক সময় মালিকের ভুল বা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিয়ম সামলানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশিক্ষক কুকুরকে একটি নিয়ম শেখানোর পর মালিক যদি বাড়িতে সেটি নিয়মিত অনুসরণ না করেন, তা হলে প্রশিক্ষণের ফল দীর্ঘস্থায়ী করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি মালিক ও পরিবারের সদস্যদেরও কিছু বিষয় শেখা জরুরি। কারণ প্রশিক্ষকের কাছে কুকুর কয়েক ঘণ্টা সময় কাটালেও দিনের বেশিরভাগ সময় সে তার মালিকের সঙ্গেই থাকে।
তাই মালিকদেরও শিখতে হয় কীভাবে কুকুরকে আদেশ দিতে হবে, কখন পুরস্কার দিতে হবে, কীভাবে সীমানা তৈরি করতে হবে এবং কুকুরের শারীরিক ভাষা ও আচরণ বুঝতে হবে। মালিক যদি সঠিকভাবে নিয়মগুলো নিয়মিতভাবে অনুসরণ করেন, তা হলে কুকুরের আচরণে পরিবর্তন আনা এবং সেই পরিবর্তন ধরে রাখা সহজ হয়।
সবশেষে কুকুর পালনের ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হলো আদর ও নিয়মের ভারসাম্য। ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন নির্দিষ্ট রুটিন, স্পষ্ট সীমারেখা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ। এতে কুকুর যেমন নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে, তেমনি পরিবারের সঙ্গেও তার সম্পর্ক হয় আরও সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা