প্রশাসনের শীর্ষ পদে দ্বিতীয় দফা বড় রদবদলের প্রস্তুতি চলছে। আর এই রদবদলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে যোগ্যদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সচিব ও সমমর্যাদার গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্ভাব্য নিয়োগের আলোচনায় অর্ধশত কর্মকর্তার নাম রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত ব্যাচের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
তবে শীর্ষ পদে নিয়োগ-পদায়ন ঘিরে তদবির ঠেকাতে সরকার কঠোর বার্তা দিয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাকরি-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তদবির করলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পদোন্নতির ক্ষেত্রে এবার শুধু ‘বঞ্চিত’ পরিচয়ই যথেষ্ট হবে না। কে কতদিন পদোন্নতি পাননি, তার সঙ্গে তার চাকরির রেকর্ড, জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা, পেশাদারিত্ব এবং সংশ্লিষ্ট পদের উপযোগিতা— সবকিছু মিলিয়ে মূল্যায়নের কথা ভাবা হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিন বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সামনে যেমন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনই তারা যোগ্যতার কঠিন পরীক্ষারও মুখোমুখি হতে পারেন। আর এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে তদবিরমুক্ত রাখতে একই সময়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার।
চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে তদবির করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। শুধু ব্যবস্থা নেওয়াই নয়, কোনো কর্মকর্তার পক্ষে কে তদবির করেছেন, কী বিষয়ে করেছেন— তার বিস্তারিত তথ্য চাকরির ডোসিয়ারে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে এই দুই পদক্ষেপকে একই বার্তার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে— বঞ্চিত হলে সুযোগ মিলতে পারে, কিন্তু তদবির করে পদ পাওয়া যাবে না।
সচিবসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি পদে নতুন নিয়োগের সম্ভাব্য তালিকায় প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তার নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মূল্যায়ন, চাকরির রেকর্ড, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট পদের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ পদোন্নতি পেলেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় কিংবা মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পাননি। কেউ ছিলেন ওএসডি। নবম ব্যাচ থেকে পরবর্তী বিভিন্ন ব্যাচেও এমন কর্মকর্তা রয়েছেন। একই ব্যাচের এক কর্মকর্তা যখন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন, তখন অন্যজন বছরের পর বছর অপেক্ষায় থেকেছেন— এমন ঘটনাও রয়েছে। এখন সেই বঞ্চনার হিসাব নতুন করে খতিয়ে দেখছে বর্তমান সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হবে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের মূল্যায়নে।
পুরোনো কয়েকটি ব্যাচে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। তাদের মধ্য থেকে সচিব হওয়ার উপযুক্ত কর্মকর্তাদের বাছাই করতে হবে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত পরের ব্যাচে কর্মকর্তার সংখ্যা কম হওয়ায় জ্যেষ্ঠতা ও পদসংখ্যার হিসাবও ভিন্ন। এখানে শুধু চাকরির বয়স বিবেচনা করলে হবে না। অবসরের আগে একজন কর্মকর্তা কতদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন, তার কী ধরনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, মাঠ প্রশাসন বা মন্ত্রণালয়ে তার কাজের রেকর্ড কেমন এবং যে পদে তাকে দেওয়া হবে, সেই পদের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার সামঞ্জস্য কতটা— এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসবে।
বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ সচিব বা সমমর্যাদার পদে নিয়োগ শুধু পদোন্নতি নয়, সরকারের নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ভুল কর্মকর্তা ভুল জায়গায় গেলে একটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি পর্যন্ত ব্যাহত হতে পারে।
অন্যদিকে শীর্ষ পদে নিয়োগ-পদায়ন ঘিরে তদবির ঠেকাতে সরকারের কঠোর বার্তা প্রশাসনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোনো কর্মকর্তা নিজে সরাসরি তদবির না করেও তার পক্ষে কেউ মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, আমলা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে গেলে সেই তথ্যও ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে নথিভুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। এমন আবেদন সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে যৌক্তিকভাবে নিষ্পত্তি করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সিভিল সার্ভিস নষ্ট করার অন্যতম প্রধান কারণ তদবিরবাজি। অতীতে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। সরকার যদি সত্যিই তদবির বন্ধ করতে চায়, তা হলে যার পক্ষে তদবির করা হবে তাকে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শুধু আর্থিকভাবে সৎ হলেই হবে না, নৈতিকভাবেও সৎ থাকতে হবে।
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নীতির সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা একরকম নয়। তাই দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তদবির বন্ধে সরকারি নির্দেশনার মধ্যেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন নিয়ে চাপের কথা জানা গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পছন্দ অনুযায়ী পোস্টিং পাওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের তদবিরের চাপ রয়েছে। ডিসি, ইউএনও এবং প্রেষণে গুরুত্বপূর্ণ পদসহ বিভিন্ন লোভনীয় পদে পোস্টিং নিয়ে তদবির বেশি হচ্ছে। কর্মকর্তাদের অনেকে নিজেদের পছন্দের পদে যেতে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করছেন। এ অবস্থায় সরকারের তদবিরবিরোধী অবস্থান এবং শীর্ষ পর্যায়ে নতুন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনের পদায়ন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, সব সরকারের সময়ই তদবিরের সংস্কৃতি ছিল। তবে নতুন সরকারের সময়ে শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় পোস্টিং ও পদোন্নতিকে ঘিরে তদবিরের চাপ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তদবিরের চাপ শুধু কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা পদায়নে সীমাবদ্ধ নেই। সচিবালয়ে দর্শনার্থীর অতিরিক্ত ভিড় নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে বৈঠকে জানানো হয়, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাবেক আমলা, চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের ভিড় বেড়েছে। বদলি, পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, স্থানীয় সুযোগ-সুবিধা ও ইজারাসহ নানা দাবি নিয়ে মানুষ সচিবালয়ে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সচিবালয়ে অতিরিক্ত মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও এসেছে। তিনি বিষয়টি দেখতে মুখ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলেছেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যথাযথ পাস বা অনুমোদন ছাড়া কেউ সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। কোনো গাড়িতে অননুমোদিত ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রত্যেক গাড়ি তল্লাশি করে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। এমনকি প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে আলাদা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বসানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে, যাতে একটি মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করে অন্য মন্ত্রণালয়ে অননুমোদিতভাবে যাতায়াত করা না যায়। পুলিশের কেউ অনৈতিকভাবে কাউকে সচিবালয়ে প্রবেশ করানোর সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। গত পাঁচ মাসে অনিয়মের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, রাজনৈতিক বা অন্যান্য প্রভাবমুক্ত রেখে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহারের নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিভিন্ন ক্যাডারে দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের সার্বিক দিক বিবেচনায় যথাসময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি