চার বছর আগেও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করত দুই ভাই-বোন সিয়াম হোসেন (১০) ও রিয়া আক্তার (১২)। বিদ্যালয়ে যেত, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। কিন্তু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তাদের চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায়। এখন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই অনেকটা বন্দি জীবন কাটছে তাদের।
শুধু সিয়াম ও রিয়া নয়, একই পরিবারের আরও দুজন সদস্যও প্রতিবন্ধী। সিয়ামের মা কোহিনূর বেগম জন্মগত বাকপ্রতিবন্ধী। বাবা মহিন উদ্দিন (৩৮) নিজেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার মেঘদাইর গ্রামের এই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে।
একদিকে নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে স্ত্রী ও দুই সন্তানের প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে মহিন উদ্দিনকে। কোনো দিন খাবার জোটে, আবার কোনো দিন অভাবের কারণে না খেয়েও থাকতে হয় বলে জানান তিনি। সন্তানদের চিকিৎসা, ওষুধ, পুষ্টিকর খাবার ও পড়াশোনার খরচ বহন করাও পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কোহিনূর বেগম কথা বলতে পারেন না। তবে নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্তানদের দেখাশোনা করেন। তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে সংসারের নানা কাজে সহযোগিতা করেন তিনি। সন্তানদের কষ্ট দেখলেও তা মুখে প্রকাশ করতে পারেন না এই মা।
অন্যদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে অটোরিকশা চালান মহিন উদ্দিন। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন নিয়মিত গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না। অটোরিকশা চালিয়ে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে সংসারের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। ফলে সন্তানদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানো কিংবা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালানোও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, একই পরিবারের চারজন প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মহিন উদ্দিনও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও তা দিয়ে চার সদস্যের পরিবারের নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। সন্তানদের লেখাপড়া ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। পরিবারটির জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার, আর্থিক সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
মহিন উদ্দিন বলেন, ‘চার বছর আগে আমার ছেলে ও মেয়ের জ্বর হয়েছিল। এরপর তারা ধীরে ধীরে হাঁটা-চলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন থেকে তারা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছে। আমি নিজেও প্রতিবন্ধী। কোনোভাবে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় গাড়ি চালাতে পারি না। আমার স্ত্রী কথা বলতে পারে না, ছেলে-মেয়েও প্রতিবন্ধী। অনেক সময় খাবারের কষ্টে দিন কাটাতে হয়। সন্তানদের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। মানুষের সহযোগিতা পেলে হয়তো তাদের জীবনটা একটু ভালোভাবে চালাতে পারব।’
এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবু ইসহাক বলেন, ‘একই পরিবারের চারজন প্রতিবন্ধী হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। তবে শুধু ভাতা দিয়ে তাদের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। পরিবারটিকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে কর্মমুখী কার্যক্রম ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সুদমুক্ত ঋণ বা ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।’
সময়ের আলো/জেডি