যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ‘বড় ধরনের হামলার’ প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী— এমন খবর প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি আর তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে চান না। মার্কিন সময় বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের সান অ্যান্টোনিওতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে আয়োজিত এক নির্বাচনি জনসভায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এমনটি মন্তব্য করেন।
তিন বলেন, আমি মনে করি চুক্তিটি এমন কিছু নয়, যা আমি সত্যিই করতে চাই, তবে আমাদের থামাতে তারা যেকোনো কিছু প্রস্তাব করতে ইচ্ছুক। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সমঝোতা চুক্তির বিষয়ে কাজ করছেন উল্লেখ করে ট্রাম্প আরও বলেন, উইটকফ তার কাজ ভালোই এগিয়ে নিচ্ছেন।
এদিকে বুধবার এনবিসি নিউজ এক মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ট্রাম্প এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা দল আগামীতে ইরানে আবারও বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করা নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই দিনে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আবারও সংঘাত শুরুর সম্ভাব্য অংশ হিসেবে ইরানের জ্বালানি খাত, অবকাঠামো এবং পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ‘ব্যাপক বোমা হামলা’ চালানো হতে পারে। এই সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম উচ্চহারে বাড়ার কারণে নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ছে— এমন উদ্বেগের মধ্যে বর্তমানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, শান্তি আলোচনায় ওয়াশিংটনের মূল সমস্যা ছিল— ইরান এখন কার নেতৃত্বে চলছে তা কেউ জানে না।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘সমস্যাটি মূলত উল্টো।’ তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং অস্পষ্ট বার্তাকেই আসল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল রফতানি প্রায় যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। ইরান বাদে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ এবং সৌদি আরব ও ইউএই মিলিয়ে দৈনিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহের পরিমাণ সংঘাতপূর্ব সময়ের মতো ১৮.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে।
পরিস্থিতি মূল্যায়নে কেপলারের প্রধান ফ্রেইট বিশ্লেষক ম্যাট রাইট জানান, সমুদ্রপথে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আর কোনো কূটনৈতিক চুক্তির জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। কূটনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে বরং কাজের ধারা মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে।
এদিকে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি ইউরোপ বা ন্যাটো ভূখণ্ডজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধা সৃষ্টি করছে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বৃহস্পতিবার গ্রিস থেকে পর্তুগালের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যা করতে চায় বা প্রয়োজন মনে করে, হুমকির কারণে তার কোনো কিছুই এখন সীমিত হয়নি। খবর আনাদুলু এজেন্সির।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নিরাপত্তা সতর্কতার পর যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে সব মার্কিন বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘাঁটিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওই ঘটনায় সন্দেহজনক কয়েকটি যানবাহনকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ঘটনাটির সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততার ‘জোরালো ইঙ্গিত’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরে স্বীকার করেন যে কিছু হুমকির কারণে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বিমানগুলো দুর্ঘটনাবশত ঘাঁটি ছেড়ে যায়নি; নিরাপত্তা হুমকি ছিল বলেই সেগুলো সরানো হয়েছিল।
রুবিওর সর্বশেষ মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সাময়িক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় সামরিক কার্যক্রমে ইরানের হুমকিকে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছে না ওয়াশিংটন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি