খুমেক হাসপাতালে শয্যা সংকট, ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ রোগী

শেখ শান্ত ইসলাম, খুলনা ব্যুরো

সারাদেশ

খুলনা অঞ্চলের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। হাসপাতালের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে

2026-10-09T12:05:31+00:00
2026-10-09T12:05:31+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
খুমেক হাসপাতালে শয্যা সংকট, ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ রোগী
শেখ শান্ত ইসলাম, খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম 
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় রোগী ও স্বজনরা। ছবি : সময়ের আলো
খুলনা অঞ্চলের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। হাসপাতালের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় ওয়ার্ডগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে মেঝে, সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা ও বারান্দার ঠান্ডা ফ্লোরে গাদাগাদি করে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। এর সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রিয় মানুষটিকে একটু সুস্থ করে তুলতে হাসপাতালের দরজায় ছুটে আসেন স্বজনরা। মনে থাকে একটাই আশা—চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে আপনজনকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সেই আশার জায়গায় যদি হাসপাতালেই শুরু হয় নতুন ভোগান্তি, বেডের বদলে ঠাঁই মেলে মেঝেতে, করিডোরে কিংবা বারান্দায়—তাহলে অসুস্থতার কষ্ট যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সকালে বহির্বিভাগে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। এর মধ্যে গুরুতর অসুস্থ ও জটিল রোগীদের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলেও শয্যা সংকটের কারণে তাদের জন্য বেড বরাদ্দ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে রোগীরা করিডোর, বারান্দা কিংবা মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন হাসপাতালজুড়ে রোগ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।


রোগীর এই অস্বাভাবিক চাপের বিপরীতে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য সহায়ক জনবলের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সীমিত জনবল নিয়ে অতিরিক্ত এই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও ক্লান্তির কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে গিয়ে তারাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ওয়ার্ড বয়ের সংকটের কারণে হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশও হুমকির মুখে পড়েছে।

ডুমুরিয়া থেকে আসা অভিভাবক মো. পারভেজ বলেন, সন্তান অসুস্থ হলে বাবা-মায়ের একটাই চিন্তা থাকে, কীভাবে তাকে দ্রুত সুস্থ করা যায়। কিন্তু এখানে এসে বেড না পাওয়ায় সেই চিন্তার সঙ্গে যোগ হয়েছে-কোথায় শিশুকে রাখব, কীভাবে রাতে তাকে দেখাশোনা করব-সেই দুশ্চিন্তা।

তেরখাদার তাসলিমা আক্তার জানান, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য নেই বলেই নানা কষ্টের মধ্যেও সরকারি এই হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অসুস্থ শিশুকে নিয়ে মেঝেতে বা করিডোরে থাকা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়, কিন্তু উপায় না থাকায় এই কষ্ট মেনে নিয়েই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।

মহেশ্বরপাশের খাদিজা বেগম বলেন, তিন দিন ধরে আমার বাচ্চাটি অসুস্থ। তার সুচিকিৎসার জন্য মেডিকেলে এসেছি, কিন্তু বেড না পেয়ে রাস্তার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। রাতে ঘুম হয় না, মশারিও টানানো যায় না। ডেঙ্গুরোগী সহ সব রোগী একসঙ্গে থাকছি। কখন যে ডেঙ্গুতে নিজেও আক্রান্ত হব, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে। 

সাতক্ষীরা থেকে আসা জাহানারা বেগম জানান, সাধারণ রোগীরা সেবা নিতে এসে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় জরুরি ওষুধ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না।

খুমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। রোগীরা যাতে চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, সে জন্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলস কাজ করছেন। তবে ৫০০ শয্যার অবকাঠামোতে এত বিপুলসংখ্যক রোগীকে দীর্ঘদিন ধরে সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। অতিরিক্ত রোগীর চাপের পাশাপাশি জনবল সংকটও রয়েছে। ফলে রোগীর চাপ সামলাতে বাড়তি শয্যা, চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো জরুরি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশনের সহায়তায় ডেঙ্গু ইউনিটের জন্য ৩০টি নতুন বেড সংযোজন করা হয়েছে। তবে সামগ্রিক রোগীর চাপের তুলনায় এই সক্ষমতা এখনও অত্যন্ত সীমিত। দীর্ঘমেয়াদে হাসপাতালের শয্যা, অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধির জন্য বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।


খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনা সিটি করপোরেশনের সহায়তায় ডেঙ্গু ইউনিটের জন্য কর্মচারীদের এক মাসের বেতনের অর্থ দিয়ে ৩০টি নতুন বেড দেওয়া হয়েছে। সমাজের বিত্তবানরা সহায়তা করলে ৩০ থেকে ৩০০ বেড হতে সময় লাগবে না। ডেঙ্গুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। খুলনা সিটিসহ গ্রাম অঞ্চলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

এদিকে সংকট সমাধানে খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ৫০টি বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রতিটি ওয়ার্ডের কমিউনিটি ক্লিনিকেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান করছেন। এছাড়া ছাত্রদল-যুবদলসহ সব নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—বাড়ির আঙিনা ও ডোবা-নালা পরিষ্কারসহ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।

খুলনা অঞ্চলের মানুষের মানসম্মত সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ ও চিকিৎসকরা। অন্যথায় এই জনবহুল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   খুমেক হাসপাতাল  শয্যা সংকট  ধারণক্ষমতা  রোগী  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: