কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার এবং তার দেখানো স্থান থেকে কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে।
তবে ৪ কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে যেতে ৩০ কিলোমিটার ঘুরিয়ে নির্জন ফসলের মাঠে নেওয়াসহ এ হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কি না— এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েক বছর ধরে মেয়েটির পরিবার কুমিল্লায় বসবাস করছে।
এ কারণে মেয়েটির জেলার ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে ধারণা থাকার কথা। এরপরও তাকে শহরের দিকে না নিয়ে উল্টোপথে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য, আসামি সুমন মিয়া কিশোরীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর কথা স্বীকার করেছে।
গতকাল রোববার সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। তিনি বলেন, গ্রেফতার সুমনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তদন্ত চলছে; অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানক্ষেত থেকে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের গলায় গামছা ছিল। কাছাকাছি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, গাড়িতে কাপড়চোপড় ও পাশে একটি হাতব্যাগ পাওয়া যায়।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত বুধবার দিবাগত রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলসংলগ্ন তিশা
বাস কাউন্টারের কাছে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশা খুঁজছিল কিশোরী। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুমনের অটোরিকশায় ওঠে সে। দর-কষাকষির পর ৩০০ টাকায় বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি হয় সুমন; কিন্তু বাড়ির পথে না গিয়ে সে উল্টো সড়ক ধরে নির্জন এলাকার দিকে যায়।
পদুয়ার বাজার থেকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার। পুলিশের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, সুমন প্রথমে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের বিজরা বাজারের দিকে যায়। পরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে লালমাইয়ের ভোরাজগৎপুরের ফসলের মাঠের কাছে পৌঁছায়। এ পথে দূরত্ব অন্তত ৩০ কিলোমিটার।
এতটা পথ ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় কী ঘটেছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। দুটি আঞ্চলিক মহাসড়কেই রাতে যানবাহন চলাচল করে। কিছু স্থানে লোকজনও কমবেশি থাকে। এ পথে কিশোরীটি কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, কোনো পর্যায়ে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন দাবি করেছে, অটোরিকশা চলার সময় কিশোরী কোনো ‘প্রতিক্রিয়া’ দেখায়নি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, পদুয়ার বাজার থেকে কিশোরীর বাসায় যেতে সর্বোচ্চ আধাঘণ্টা লাগার কথা। অথচ তাকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘মেয়েটি যদি ঘটনাস্থলে বা এর আগে অন্তত ৯৯৯-এ কল দিত, তা হলে হয়তো আমাদের এমন একটি মৃত্যু দেখতে হতো না।’
পুলিশের দাবি, নির্জন জায়গায় পৌঁছানোর পর কিশোরী পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকাতে ধস্তাধস্তি করে। পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। এরপর ধানক্ষেতে নিয়ে মুখ মাটির দিকে রেখে পা দিয়ে মাথা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করে।
পুলিশ জানিয়েছে, রাত ২টা ৫৪ মিনিটে কিশোরী তার বাবাকে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল। ঘুমে থাকা বাবা তখন সেটি দেখেননি। ভোরের দিকে দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন। এর মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করছিল। পরে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন।
কিশোরী কী পরিস্থিতিতে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল, সে সময় বিপদের আশঙ্কা করছিল কি না এবং লোকেশন পাঠানোর পর কী ঘটেছিল— এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে ওই সময় পর্যন্ত ফোনটি তার কাছে ছিল, তা বোঝা যায়।
সিসি ক্যামেরা ফুটেজে কিশোরী : ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সুমন জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়টি স্বীকার করেছে। তবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ধর্ষণ হত্যার আগে, নাকি পরে ঘটেছে, সে বিষয়েও পুলিশ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসি ক্যামেরা ফুটেজে কিশোরীকে অটোরিকশায় বসে থাকতে দেখা গেছে। ফুটেজে তাকে পেছনের বাঁ পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সাংবাদিকরা। পুলিশ জানায়, এখন পর্যন্ত সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি তদন্তে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, বান্ধবীর কাছে যাওয়ার কথা বলে ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হয়েছিল কিশোরী। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। কক্সবাজার থেকে আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি বাসে বুধবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ফেরে সে। রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে। এরপর একটি দোকানে মুঠোফোন চার্জ দেয়। রাত সোয়া ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে যায়। পরে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় ওঠে বলে পুলিশের ভাষ্য।
৪ থকে ৭ অক্টোবর রাত পর্যন্ত মেয়েটি কীভাবে বিভিন্ন স্থানে গেছে— এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ওই চার দিনে পরিবার থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়নি। ঘটনার পর কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেছিলেন, কিশোরী বুধবার রাতে বাসায় ফিরবে বলে ওই দিন বিকালে পরিবারকে জানিয়েছিল।
পুলিশ বলেছে, হত্যার পর অটোরিকশা ঘটনাস্থলে ফেলে আইফোন নিয়ে চলে যায় সুমন। পরে কচিকাটা মসজিদের কাছে একটি পুকুরে গোসল করে। এরপর অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রাখে। পরে চট্টগ্রামে চলে যায়। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একই দিন বাখরাবাদ থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। ফোনটির বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার কথা জানায় পুলিশ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে