মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন প্রয়োজনে নানা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় আসার পর যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছিল তাকেই মূলত ‘মদিনা সনদ’ হিসেবে অবহিত করা হয়। এই সনদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাষ্ট্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রতিফলন। মূলত মদিনার মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে শান্তি বজায় রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা আনার জন্যই এটি তৈরি হয়।
এই চুক্তিতে মদিনার সব মানুষকে আলাদা না ভেবে একটি একক সমাজ বা ‘উম্মাহ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে সবার দায়িত্ব ও অধিকার স্পষ্ট করা হয়, সবাইকে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং কোনো বহিঃশত্রু হামলা করলে সবাই মিলে প্রতিরোধ করার কথা বলা হয়। আধুনিক মানবাধিকার ও সংবিধানিক চিন্তার সঙ্গে এর কিছু নীতির তুলনা করা গেলেও একে তার নিজস্ব নববী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই মূল্যায়ন করা অধিক যুক্তিসংগত।
এর দ্বারা কেবল তৎকালীন রাজনৈতিক কোন্দল মেটানোই উদ্দেশ্য ছিল না। এর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ যুগের রাষ্ট্র পরিচালনা, সাধারণ মানুষের অধিকার এবং সব মতের মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে থাকার এক দারুণ দৃষ্টান্ত তৈরি করা হয়েছিল। মোট ৪৭টি ধারায় গঠিত এই সনদে বিচারব্যবস্থা, অপরাধের সাজা, রক্তের ক্ষতিপূরণ, একে অপরকে সাহায্য করা, যুদ্ধ-শান্তি ও নিরাপত্তার মতো জরুরি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি কেবল সাধারণ একটি সামাজিক চুক্তি ছিল না। একটি দেশ বা সমাজ কীভাবে সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে পারে তার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা ছিল।
এই সনদের মাধ্যমে বংশ, ধর্ম বা গোত্রীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া মহানবী (সা.)-এর কেন্দ্রীয় বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে সমান সুবিচার নিশ্চিত করা হয়। ‘দ্বীনের ব্যাপারে জবরদস্তি নেই’— কুরআনিক এই মৌলিক নির্দেশনার আলোকে অমুসলিমদের স্বকীয়তা, জান ও মালের নিরাপত্তা এবং নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা প্রদান করে একটি সমৃদ্ধ বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের মডেল গড়ে তোলা হয়।
দীর্ঘদিনের গোত্রীয় সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধের রাজনীতি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য মদিনা উপত্যকাকে রক্তপাতমুক্ত পবিত্র ও নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করা হয়। যার ফলে সামাজিক সংহতি ও শান্তির ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রদর্শনে থমাস হবস, জন লক ও রুশো কর্তৃক উপস্থাপিত ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের’ প্রায় এক হাজার বছর আগেই মহানবী (সা.) শাসক ও জনগণের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব সংবলিত এই সনদ বাস্তবায়ন করেন। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় মদিনা সনদ কেবল বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবেই সমাদৃত হয় না; বরং বর্তমানের যেকোনো সংঘাতময় বিশ্বে ধর্মীয় বহুত্ব রক্ষা ও সমন্বয় সাধন করে টেকসই রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার এক অনুপম দিকনির্দেশনা হিসেবে গণ্য হয়।
তবে মদিনা সনদকে হুবহু আজকের যুগের সংবিধানের সমান মনে না করে তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটেই এর মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ আধুনিক সংবিধানে ক্ষমতার ভাগাভাগি, নির্বাচন ব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলবে তার বিস্তারিত রূপরেখা থাকে, যা মদিনা সনদে ছিল না। মদিনা সনদের আসল সাফল্য হলো, বহুকাল আগেই নানা জাত ও ধর্মের মানুষকে নিয়ে শান্তিতে বাস করার জন্য এটি একটি চমৎকার লিখিত চুক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
আধুনিক মানবাধিকার ও সংবিধানের সঙ্গে মদিনা সনদের তুলনা করলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
আধুনিক যুগের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাখা দরকার। মদিনা সনদকে হুট করে আজকের যুগের কোনো গণতান্ত্রিক সংবিধান বা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে দেখা হয়তো ঐতিহাসিক দিক থেকে পুরোপুরি সঠিক হবে না। কারণ এতে আধুনিক সংবিধানের মতো শাসকের ক্ষমতা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার বিস্তারিত কাঠামো ছিল না।
তাই একে আজকের কোনো ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি না মিলিয়ে তখনকার নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই বোঝা যুক্তিসংগত। আজকের বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন ও শান্তিময় পরিবেশ তৈরিতে এই মূল্যবোধগুলো হতে পারে এক দারুণ নির্দেশক।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে