কুমিল্লার ধানক্ষেতে নৃশংস খুনের শিকার সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা মামলায় আলোচনায় আসা কথিত প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরীকে কক্সবাজার থেকে আটক করে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে শহরের কলাতলী এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশের ফোকাল পয়েন্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. অহিদুর রহমান।
তিনি বলেন, ওই তাজনিম খুন হওয়ার আগে কক্সবাজারে আসার কথা প্রচার পেয়েছে। আর কক্সবাজারে রাজুর সঙ্গে সে রাতে ছিল এবং চলে যাওয়ার জন্য রাজুই টিকিটের ব্যবস্থা করে দেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে তার কতটুকু সংশ্লিষ্টতা, তা নির্ণয় করবেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আমরা তাকে ৫৪ ধারায় আটক করে রেখেছি। কুমিল্লা থেকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পৌঁছালে আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে হস্তান্তর করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় ওই কিশোরীকে নিয়ে কক্সবাজারের কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন রাজু। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় কিশোরীর নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’, বয়স ১৮ বছর। সেখানে তাকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। রাজুর পরিচয়ে লেখা হয়, বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেলের এক কর্মচারী জানান, পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লেখা রয়েছে। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের একসঙ্গে বের হতে দেখা গেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাজনিম কক্সবাজারে যায়। পরে কুমিল্লায় ফেরার জন্য রাজুই তাকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসের টিকিট কেটে দেন। কুমিল্লায় পৌঁছে বাস থেকে নামার পর বাড়ি ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে সে।
পুলিশের দাবি, চালক সুমন মিয়া তাকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন। গত বৃহস্পতিবার সকালে ওই ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতের বাবার করা হত্যা মামলায় অটোরিকশাচালক সুমনকে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিশোরীর ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের আগে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের সরাসরি অবস্থান পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিল কিশোরী। তবে গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকায় তার বাবা বার্তাটি দেখতে পাননি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অটোরিকশায় ওঠার পরও রাজুর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল কিশোরীর। পরে রাতে তার সরাসরি অবস্থান জানানোর সুবিধাটি বন্ধ হয়ে গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ওই কিশোরী। পুলিশের দাবি, প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায় সে। পরে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে যায়।
রাজুকে আটকের পর তার কক্সবাজারে যাওয়া, সেখানে হোটেলে অবস্থান এবং কুমিল্লায় ফেরার যাত্রাপথ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে রাজুর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী এবং হত্যাকাণ্ডে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি পুলিশ।
কিন্তু রাজু জানিয়েছেন কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে তাজনিম তার কাছে এসেছিল এবং বাবা-মায়ের বার বার কল আসায় রাজু তাকে পরিবারের কাছে ফিরতে গাড়ির ব্যবস্থা করে দেয়। সিএনজিতে ওঠায় রাজু তাকে বকাও দিয়েছিল এবং বাড়ির গেইট খোলা না পেলে বাইরে বসে থাকতে লাইভ লোকেশনে পরামর্শ দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন রাজু।
সময়ের আলো/জেডআই