টানা পাঁচ ইনিংসে চারবার শূন্য, ব্যাট হাতে চরম ব্যর্থতা, মাঠের বাইরেও সমালোচনার তীব্র ঝড়। লিটন কুমার দাসের সময়টা যেন কোনোভাবেই ভালো যাচ্ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ ঐতিহাসিক সাফল্য পেলেও ব্যক্তিগতভাবে দুঃস্বপ্নের এক সিরিজ কেটেছে তার। এরপর এশিয়ান গেমসের টি-টোয়েন্টিতেও ব্যাট হাতে ব্যর্থতা, সঙ্গে গণমাধ্যমের কঠিন প্রশ্ন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা। সব মিলিয়ে চাপটা ছিল পাহাড়সম। সেই চাপকে পেছনে ফেলে আবুধাবি টেস্টে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যাট হাতে জবাব দিলেন লিটন। প্রথম ইনিংসে কার্যকর ফিফটির পর দ্বিতীয় ইনিংসে তুলে নিলেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি। শূন্যের অন্ধকার পেরিয়ে তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত স্বস্তির নয়, বাংলাদেশের জন্যও বড় এক প্রাপ্তি।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজে তিন ইনিংসে ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছিলেন লিটন। কিন্তু প্রতিবারই ফিরেছেন কোনো রান না করে। এরপর এশিয়ান গেমসের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও রানের দেখা পাননি, সেখানেও একবার আউট হয়েছেন শূন্য রানে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টানা পাঁচ ইনিংসে চারটি শূন্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছিল তার ফর্ম নিয়ে। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যাট হাতে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না লিটনের সামনে। তবে ব্যাটিংয়ের ব্যর্থতার পাশাপাশি মাঠের বাইরের পরিস্থিতিও সহজ ছিল না।
এশিয়ান গেমসে ব্যর্থতার পর গণমাধ্যমের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাকে। সাংবাদিকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার পর সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাকে ঘিরে তৈরি হয় তিক্ত পরিবেশ। এমন পরিস্থিতিতে একজন ব্যাটারের জন্য নিজের স্বাভাবিক খেলায় মনোযোগ ধরে রাখা যে কঠিন, তা বলাই বাহুল্য।
আবুধাবি টেস্টে প্রথমবার রানের খাতা খুলেই যেন সেই চাপ থেকে খানিকটা মুক্তি পান লিটন। তার স্বস্তির হাসি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে রানের খাতা খোলাকেই শেষ কথা হতে দেননি তিনি। প্রথম ইনিংসে ৫৩ রানের কার্যকর ইনিংস খেলে আস্থার বার্তা দেন। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে যা করলেন, তাতে মিলল আরও বড় স্বস্তি। বাংলাদেশ তখন প্রতিপক্ষের নাগালের বাইরে লক্ষ্য নিয়ে যাওয়ার পথে। ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নামা লিটনের দায়িত্বও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুধু রান করাই নয়, প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ না দিয়ে দলকে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই ছিল তার কাজ। সেই দায়িত্ব দারুণভাবে সামলেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার।
মেহেদী হাসান মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে সপ্তম উইকেটে গড়েন ১৪৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। লিটনের ব্যাটে আসে ১১৭ বলে ১০৪ রান। ইনিংসজুড়েই ছিল ওয়ানডে মেজাজের ব্যাটিং। কখনো চাবুকের মতো লেট কাট, কখনো চোখজুড়ানো স্ট্রেট ড্রাইভ, আবার কখনো সাবলীল শটের প্রদর্শনী। প্রতিপক্ষকে কিছু সুযোগ দিলেও তার আগ্রাসী ব্যাটিং আফগান বোলারদের চাপে রেখেছে। সপ্তম উইকেটে মিরাজের সঙ্গে এই জুটিই বাংলাদেশের ইনিংসকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে। এই সেঞ্চুরি লিটনের টেস্ট ক্যারিয়ারের সপ্তম। টেস্টে তার ফিফটির সংখ্যা এখন ২১। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে ৯ হাজার রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তিনি। এসব পরিসংখ্যানই মনে করিয়ে দেয়, লিটন কতটা প্রতিভাবান এবং বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে তার গুরুত্ব কতখানি।
তবু তার ব্যাটিং নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। টেস্টে ফিফটি করার পর অনেকবারই বড় ইনিংস খেলতে পারেননি লিটন। অর্ধশতককে সেঞ্চুরিতে রূপান্তর করার হার আরও ভালো হলে তার পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে আরও উজ্জ্বল হতে পারত। যে ব্যাটিং প্রতিভা তাকে বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য দেয়, সেটির পূর্ণ প্রতিফলন সবসময় দেখা যায়নি। সেই আক্ষেপ হয়তো থাকবেই।
তবে আপাতত সেই হিসাব-নিকাশের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে তার ফিরে আসা। টানা ব্যর্থতা, চার শূন্যের চাপ এবং মাঠের বাইরের সমালোচনার পর এমন একটি সেঞ্চুরি লিটনের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এটি স্বস্তির খবর। কারণ, সামনে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। সেই সিরিজে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা লিটনেরই।
ব্যাট হাতে এমন আত্মবিশ্বাসী লিটনকেই অধিনায়ক হিসেবে দেখতে চাইবে বাংলাদেশ। শূন্যের গেরো ভেঙে শতকের আনন্দে ফেরার এই মুহূর্ত তার জন্য নতুন শুরুর ইঙ্গিত হয়ে থাকুক।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি