ঢাকার খাবারের জগতে বিরিয়ানি, কাচ্চি কিংবা ফাস্ট ফুডের পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নানা পদ। বাঁশের ভেতরে রান্না করা মুরগি, শুঁটকি দিয়ে তৈরি ঝোল, ভিন্ন স্বাদের নুডলস, লাকসু সালাদ কিংবা পাহাড়ি শাকসবজি প্রতিটি খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আলাদা সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের গল্প। চাকমা, মারমা, রাখাইনসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর রান্নার স্বাদ নিতে এখন আর পার্বত্য চট্টগ্রামে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। রাজধানীর কয়েকটি রেস্তোরাঁ ও রাস্তার খাবারের দোকানেই মিলছে এসব পদ। জায়গাভেদে খাবারের ধরন, পরিবেশন ও দামেও রয়েছে পার্থক্য।
ঢাকায় পাহাড়ি খাবারের পরিচিত নামগুলোর একটি হেবাং। চার বোন বিপ্লী, প্রিয়াংকা, সুচিন্তা ও স্বস্তি চাকমা মিলে ঢাকায় পাহাড়ি খাবারের অন্যতম জনপ্রিয় রেস্তোরাঁটি শুরু করেন। মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় রয়েছে আরও দুটি শাখা। যারা প্রথমবার পাহাড়ি খাবার খেতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে ভালো সূচনা। বিপ্লী চাকমা বলেন, ‘আমাদের রেস্তোরাঁয় পাহাড়ি মুরগি এবং সবজি নিয়ে আসা হয় খাগড়াছড়ি থেকে। রাঙামাটি থেকে আনা হয় অন্যান্য মাছসহ কাপ্তাই লেকের চিংড়ি। শীতকালে রেস্তোরাঁয় নিয়ে আসা হয় পাহাড়ি হাঁস।’
শুধু পার্বত্য অঞ্চল নয় শহরবাসীকে গারো সম্প্রদায়ের খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ফার্মগেটের গ্রিন রোডে ‘জাবা’। এটি গারো ঐতিহ্যবাহী খাবারের একটি রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁটিতে পাওয়া যায় বিন্নি পিঠা, তোজা, হিসাল পিঠা, মোয়া মুগলি, বিন্নি পায়েশ এবং ঐতিহ্যবাহী গারো রন্ধনশৈলীর বিভিন্ন ভর্তা, মাছ ও মাংসের পদ। সিজনাল লাটকন জুসসহ নানা ধরনের গারো খাবার।
বান্দরবানের মারমা মেয়ে কিকিসাইয়া ও তার বোন কিকিস্যুয়ে মিলে শুরু করেন সংসদ ভবনের সামনের ছোট্ট ফুডকার্ট ‘রো-ওয়া-দো’। এই দোকানে পাওয়া যায় পাহাড়ি খাবার মুন্ডি ও লাকসু। চাইলে সঙ্গে ডিম ও মুরগি যোগ করা যায়। সে ক্ষেত্রে দাম কিছুটা বেড়ে যায়। এ ছাড়া শুক্রবারে বিশেষভাবে তৈরি হয় ‘ব্যাম্বু চিকেন’। চাপাতা ছাড়া পাহাড়ি ফল, চিনি ও মধু দিয়ে তৈরি রোজেলা চা খেতে চাইলেও সংসদ ভবনের সামনের ফুডকার্টগুলোয় যাওয়া যায়।
রেস্তোরাঁর বদলে রাস্তার খাবারের দোকানে বসে পাহাড়ি স্বাদ নিতে চাইলে আগারগাঁওয়ের আইসিটি রোড ও পরিসংখ্যান রোডের পাশে টুম্বাসে যাওয়া যাবে। টুম্বাসের পরিচিত পদ মুংডি, মুরগির লাকসু, কাঁকড়া ভাজা ও পাহাড়ি মাশরুম ভাজা। পাশের ফাদাং টাংয়ে মুংডি, লাকসু, মোমো এবং বিশেষ দিনে বাঁশে রান্না মুরগি পাওয়া যায়। মুংডি সাধারণ নুডলসের মতো নয়। চালের নুডলস, মুরগির স্বাদের ঝোল, ডিম, শুঁটকি ও মসলার মিশেলে তৈরি হয় এই পদ। অন্যদিকে লাকসু হলো মুরগির মাংস, পেঁয়াজ, মরিচ ও বিভিন্ন মসলায় তৈরি সালাদধর্মী খাবার। স্বাদে ঝাল, টক ও মসলার বৈচিত্র্য থাকায় দুটিই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়।
সিএইচটি কালিনারি পার্বত্য চট্টগ্রামের খাবারের খোঁজে এই রেস্তোরাঁটিও বিবেচনায় রাখা যায়। জনপ্রিয় খাবার এর মধ্যে পাহাড়ি চাপনি, কাঁকড়া ভুনা, মুংডি এবং পাহাড়ি মুরগি ভুনা অন্যতম। তবে বাঁশে রান্না মুরগি বা নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহ্যবাহী পদ খেতে চাইলে আগে ফোন করে নিশ্চিত হওয়া ভালো। এখানে ইনস্ট্যান্ট খাবার পরিবেশন করা হয় না। যাওয়ার ২-৩ ঘণ্টা আগে যোগাযোগ করে অর্ডার করার পরামর্শ দেওয়া থাকে।
পাহাড়ি খাবার খুঁজতে পারেন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আশপাশের খাবারের দোকান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরেও। এসব জায়গায় বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ি খাবার ও পণ্যের অস্থায়ী স্টল বসে। তবে সব দোকানে প্রতিদিন একই খাবার পাওয়া যায় না। তাই নির্দিষ্ট পদ খেতে চাইলে দোকানের বর্তমান অবস্থান ও মেনু জেনে নেওয়া ভালো।
পাহাড়ি খাবারের দাম নির্ভর করে খাবারের ধরন, পরিমাণ ও বিক্রির জায়গার ওপর। পাহাড়ি খাবারের আকর্ষণ শুধু ভিন্ন স্বাদে নয়, এর রান্নার ধরনেও। বাঁশে রান্না, স্থানীয় শাকপাতা, শুকনো মাছ ও নানা মসলার ব্যবহার এসব খাবারকে আলাদা পরিচয় দেয়। তবে চাকমা, মারমা, রাখাইনসহ প্রতিটি জনগোষ্ঠীর খাবার ও রান্নার ঐতিহ্য এক নয়। তাই সব পদকে এক নামে না দেখে তাদের নিজস্ব পরিচয় জানার আগ্রহও থাকা প্রয়োজন। ঢাকার ব্যস্ত জীবনে নতুন স্বাদের সন্ধান করতে চাইলে পাহাড়ি খাবার হতে পারে দারুণ একটি অভিজ্ঞতা। কখনো এক বাটি মুংডি, কখনো ঝাল লাকসু, আবার কখনো বাঁশে রান্না মুরগি প্রতিটি পদই খাবারের টেবিলে নিয়ে আসে ভিন্ন অঞ্চলের গল্প। যাওয়ার আগে রেস্তোরাঁর ঠিকানা, খোলার সময়, খাবারের প্রাপ্যতা ও দাম যাচাই করে নিলে ভালো হয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা