কিউআর কোড মানে হচ্ছে দ্রুত রেসপন্স করা। এখনকার পরিস্থিতিতে এই কিউআর কোড নিয়ে সবাই যেভাবে মগ্ন, এর আগে কি এর প্রয়োজন সেভাবে কখনো মনে হয়েছিল। আজ থেকে ৩২ বছর আগে জাপানি অটোমোবাইল কোম্পানির একজন প্রকৌশলী এই বিষয়টি আবিষ্কার করেছিলেন। সেই কোম্পানির নাম ছিল ডেনসো ওয়েভ। আর যে প্রকৌশলী এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আবিষ্কার করেন তিনি হলেন মাসাহিরো।
কেন তিনি এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেন। আর কেনই বা এটি তার মনে চিন্তার খোরাক জোগাল? অটোমোবাইল কোম্পানিতে কাজ করার সময় তিনি প্রায়ই দেখতেন— যেসব আটোমোবাইলের পার্টস কারখানায় দ্রুত স্ক্যান করতে পারছেন না, তখন তিনি আপন ভাবনায় জড়িয়ে পড়লেন। কোম্পানির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে একটি কোড আবিষ্কার করার চিন্তা করলেন। যেই চিন্তা তেমনি তার কাজ। বেশি পরিমাণ তথ্য দ্রুত পড়ার উপযোগী করতে একটি কোড তৈরি করে বসলেন। যে কোড দিয়ে দ্রুত পড়ার উপযোগী করা যায়। বেশ কিছুদিন গবেষণার পর তিনি আবিষ্কার করলেন দ্বিমাত্রিক কোড। যা পরবর্তীতে কিউ আর কোড নামে পরিচিতি লাভ করে।
একসময় মাসাহিরো চিন্তা করলেন এই কোড তৈরি করে শুধু একটি অটোমোবাইল কোম্পানির কাছে রাখলে চলবে না। তিনি কোম্পানিকে বোঝালেন এই কোড সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। যেন যেকোনো হিসাব-নিকাশের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। তার কথা শুনে পরবর্তীতে এই কিউ আর কোডের পেটেন্ট অধিকার নিজের কাছে ধরে রাখলেন না। এটি তখন সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন। বিনামূল্যে এটি ব্যবহার করতে পারবে, এটি সবার কাছে প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হলেও পরে তা বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। শুধু তাই নয়, এই কিউআর কোড বিশ্বজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
আবিষ্কারের তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে এটি আন্তর্জাতিক মাপকাঠি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপরেই ২০০০ সালে কিউ আর কোড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সংস্থা এর অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে এটি বিশ্বব্যাপী দাফতরিক ও শিল্প ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
২০০২ সালে জাপানে প্রথম এমন মোবাইল ফোন বাজারে আসে যেগুলোতে বিল্ট ইন কিউআর রিডার বা স্ক্যানার ছিল। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রথম কিউ আর কোডের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে। তবে এটি তখন মূলত জাপানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
২০১০ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের পণ্যের প্রচার ও মার্কেটিংয়ের জন্য কিউ আর কোড ব্যবহার শুরু করে। স্মার্টফোনের বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের অংশে পরিণত হয়। তবে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে স্পর্শহীন লেনদেন ও সেবার প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়ে যায়। রেস্তোরাঁর মেনু দেখা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও বিভিন্ন আদান প্রদানে কিউআর কোডের ব্যবহার এক অভাবনীয় বিপ্লব সৃষ্টি করে।
বর্তমানে কারখানার যন্ত্রাংশ ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট ও তথ্য প্রযুক্তির সব ক্ষেত্রেই কিউ আর কোড একটি অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালে অ্যাপল তাদের আইওএস অপারেটিং সিস্টেমে ও পরবর্তীতে অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলো তাদের ডিফল্ট ক্যামেরা অ্যাপে কিউআর কোড স্ক্যানার যুক্ত করে। এর ফলে ব্যবহারকারীদের আলাদা কোনো থার্ডপার্টি অ্যাপ ডাউনলোড করার ঝামেলা দূর হয়। কিউআর কোড স্ক্যান করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।
জানা গেছে, ১৯৯৪ সালে পেটেন্ট করার পরই ডেনসো ওয়েভ ঘোষণা দেয়,তারা এর কোনো রয়্যালিটি ব্যবহার ফি নেবে না। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো শিল্প খাতে যেন সবাই এটি কোনো বাধা ছাড়াই ব্যবহার করতে পারে। এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তই কিউ আর কোডকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি