নিজেদের পথ নিজেরাই গড়েন তারা

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধা শহরের পুলবন্দি বাজারে ৫০০ টাকা ভাড়ার ছোট্ট দোকান ‘শরিফুল পেপার হাউস’। শেলফ্-এ সাজানো কাগজের কলম আর খাতা। দোকানি শরিফুল

2026-10-15T06:21:48+00:00
2026-10-15T06:21:48+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
নিজেদের পথ নিজেরাই গড়েন তারা
কাগজের কলমে জীবিকা, সাত বছর ধরে বেকার ডিগ্রিধারী; গাইবান্ধার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের চলার পথে নেই টেকটাইল, নাগালে নেই চাকরি।
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:২১ এএম 
ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধা শহরের পুলবন্দি বাজারে ৫০০ টাকা ভাড়ার ছোট্ট দোকান ‘শরিফুল পেপার হাউস’। শেলফ্-এ সাজানো কাগজের কলম আর খাতা। দোকানি শরিফুল ইসলাম চোখে দেখেন না, কিন্তু হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি পণ্যের দাম আর হিসাব তার মুখস্থ। ২৯ বছর বয়সী এই যুবক করুণার অপেক্ষায় বসে থাকেননি, নিজের পথ নিজেই বানিয়ে নিয়েছেন।

আজ ১৫ অক্টোবর, বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস। উত্তরের নদ-নদীবিধৌত জেলা গাইবান্ধায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সেই পথ কতটা সুগম, তা খুঁজে দেখা হলো।

১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সাদাছড়ির ব্যবহার প্রচলিত হয়। ১৯৬৪ সালে মার্কিন কংগ্রেসের আইনে ১৫ অক্টোবর সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবসের স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে জাতীয় অন্ধ সংস্থা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাওয়া ৫০০ সাদাছড়ি বিতরণ করে প্রথম সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৯৬ সাল থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সাদাছড়ি- নিরাপদ পথচলার প্রতীক, আত্মনির্ভরতার শক্তি।’

সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের উত্তর ফলিয়া গ্রামের শরিফুল জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সমাজসেবা অধিদফতরের সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ব্রেইলে পড়েছেন। এরপর অডিও শুনে ও শ্রুতিলেখকের সহায়তায় ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগ থেকে ২০২১ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

পরিবারে অভাব, বৃদ্ধ বাবা সংসার চালাতে অক্ষম। পড়াশোনা থেমে যাওয়ার উপক্রম হলে শুরু করেন ‘গ্রিন ইকোনমি’ নামে কাগজের কলম ও নোটবুক তৈরির ক্ষুদ্র উদ্যোগ। ৬ টাকায় তৈরি কলম বিক্রি হয় ১০ টাকায়, ১৫ টাকার খাতা, ২০ টাকায়। মাসে বিক্রি ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা, নিট লাভ ৩ থেকে ৪ হাজার। স্ত্রী তানিয়া আকতার দোকান সামলাতে পাশে থাকেন। সম্প্রতি গাইবান্ধা শিল্প ও বাণিজ্যমেলায় বিশেষ উদ্যোক্তা কোটায় মাত্র ১০ টাকায় তাকে একটি স্টল দেওয়া হয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. হাসমত আলী সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ইউনিয়ন সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।

তবে সবার গল্প একরকম নয়। সাজ্জাদ হোসাইন সাজু, মাহাবুব শেখ, শরিফুল ইসলাম, রাশেদুল শেখসহ একদল উচ্চশিক্ষিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া শেষ করে বছরের পর বছর চাকরির আশায় ঘুরছেন। কেউ স্নাতকোত্তর, কেউ লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। একজন জানান, কোটা থাকা সত্ত্বেও মৌখিক পরীক্ষায় তিনি বাদ পড়েছেন। তার কথা, ‘আমরা তো আর করুণা চাচ্ছি না। সংবিধানে মৌলিক অধিকার আছে, রাষ্ট্র তা দিতে বাধ্য।’


আরেকজনের ক্ষোভ ব্যবস্থার ওপর। তাকে চাকরির প্রতিযোগিতায় নামতে হয় এমন একজনের সঙ্গে, যার চোখ-কান সবই ভালো এবং যিনি একই মাস্টার্স পাস। শিশুকালে কবিরাজি চিকিৎসায় তার চোখের সমস্যা জটিল হয়েছিল। ঢাকায় তিন হাসপাতালে চারবার অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা জানান, চোখের মণি ও স্নায়ু নষ্ট হয়ে গেছে। প্রাথমিকে শিক্ষকের মুখে শুনতে হয়েছে, ‘তোমার দ্বারা কিছু হবে না।’ কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলে মাও পড়াশোনা ছাড়তে বলেছিলেন। সেই মা এখন দিনমজুরি করে সংসার চালান। তবু তাঁর বিশ্বাস, দৃষ্টিশক্তি স্বপ্নে বাঁধা হতে পারে না।

একজন প্রায় সাত বছর বেকার। চাকরির বয়স ফুরিয়ে আসছে, সমাজের কটাক্ষও সইতে হচ্ছে। আরেকজনের প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা, বাবা কাজ করতে না পারলে সংসার কীভাবে চলবে। তাদের জানা, গাইবান্ধার এক শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণী নির্বাহী আদেশে চাকরি পেয়েছেন। তাই গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সরকার দলীয় সাংসদ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তারা একটি চাকরির আকুতি পৌঁছাতে চান।

জেলায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সহায়তার কাঠামো একেবারে নেই, তা নয়। সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত রিসোর্স শিক্ষক পাঠদান করেন, বিনামূল্যে ব্রেইল বই মেলে, আছে ১০ শয্যার হোস্টেল। সুখনগরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে মেলে থেরাপি, দৃষ্টি পরীক্ষা ও সহায়ক উপকরণ। চরাঞ্চলে যায় ভ্রাম্যমাণ থেরাপি ভ্যান। দুর্যোগপ্রবণ মোল্লার চর, কামারজানী, বেলকা ও কঞ্চিবাড়ীতে এসকেএস ফাউন্ডেশন ও জিইউকে কাজ করছে। তবু চাহিদার তুলনায় সাদাছড়ি ও সহায়ক উপকরণের সরবরাহ সীমিত, আর তথ্যের অভাবে চরের অনেকে সহায়তার বাইরে থেকে যান।

সাধারণ সাদাছড়ির দাম প্রায় ২০০ টাকা। এটুআই, ইউএনডিপি ও জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আল্ট্রাসনিক সেন্সরযুক্ত ডিজিটাল ছড়ি এসেছে, যা সামনে চার মিটারের মধ্যে বাধা বা খোলা ম্যানহোল থাকলে কম্পন বা শব্দে সতর্ক করে। কিন্তু গাইবান্ধার সড়কে টেকটাইল ফুটপাত নেই। খোলা ড্রেন, রাস্তায় দোকানের মালামাল আর গাছের নিচু ডালে সেন্সর বারবার সংকেত দিয়ে বিভ্রান্ত করে। অটোরিকশার শব্দ ও যানজটে অডিও সংকেত শোনা যায় না। দেশীয়ভাবে তৈরি প্রতিটি ছড়ির খরচ প্রায় ৭ হাজার টাকা, যা দরিদ্র প্রতিবন্ধীর নাগালের বাইরে।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাসে ২০০ টাকা ভাতা পেতেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উপকারভোগী ৩৮ লাখ, ভাতা মাসে ১ হাজার টাকা, বরাদ্দ ৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার বেশি। বিকাশ, নগদ বা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে টাকা সরাসরি গ্রহীতার হাতে পৌঁছায়।

আইনেও সুরক্ষা আছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা অনুযায়ী, সাদাছড়ি উঁচালে চালককে থামতে হবে। বাস্তবে অসচেতনতা ও নজরদারির অভাবে এ সুরক্ষা প্রায়ই কাগজেই থেকে যায়। আর ভাতা দিয়ে স্থায়ী সমাধান হয় না। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ঋণ আর সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান ছাড়া স্বনির্ভরতা আসে না।

শরিফুলরা নিজেদের পথ নিজেরা গড়েছেন, কিন্তু সবার সে সুযোগ নেই। জেলা ও উপজেলা শহরের ফুটপাতে টেকটাইল টাইলস বসানো, খোলা ম্যানহোল ঢাকা ও দখল উচ্ছেদ জরুরি। স্মার্ট ছড়িতে ভর্তুকি বা বিনামূল্যে বিতরণ দরকার। চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষায় সাদাছড়ির সংকেত মানার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণের সুযোগ দিতে হবে। আর সরকারি চাকরির কোটায় নিয়োগ প্রক্রিয়া, বিশেষ করে মৌখিক পরীক্ষা, হতে হবে স্বচ্ছ ও প্রতিবন্ধীবান্ধব।

সাদাছড়ি কেবল অন্ধত্বের প্রতীক নয়, এটি স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও নিরাপত্তার নাম। চরের মেঠোপথ থেকে শহরের ব্যস্ত সড়ক পর্যন্ত পথ নিরাপদ হলে এবং করুণার বদলে অধিকার মিললে, তবেই এই দিবসের উদ্যাপন সার্থক হবে।


সময়ের আলো/এমকে
  বিষয়:   নিজেদের পথ  নিজেরাই গড়েন  তারা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: