মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর। ছবি : সংগৃহীত বাংলাদেশের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’কে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে জাপান। এ লক্ষ্যে একটি ‘শিল্প মূল্যশৃঙ্খল’ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জাপানের কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন চলতি মাসের ২৬ তারিখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। সফরে মাতারবাড়ি শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য হিন্দু জানিয়েছে, টোকিওর কূটনৈতিক সূত্রগুলো মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও শিল্পোন্নয়নের একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘মাতারবাড়ি বন্দর বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে।’
জাপানের অর্থায়নে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ি বন্দরকে ঘিরে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬-৩১ মেয়াদের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের আর্থিক সহায়তা চাইতে পারেন। এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত আগস্টে তিনি মাতারবাড়ি সফর করেন এবং সেখানে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবহিত হন।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে মাতারবাড়ি হবে বাংলাদেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। বর্তমানে বড় জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। মাতারবাড়ি বন্দর চালু হলে পণ্য পরিবহন, আমদানি-রফতানি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানি কূটনীতিকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে জাপান থাইল্যান্ডের ব্যাংকককে কেন্দ্র করে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির অভিজ্ঞতাকে আদর্শ হিসেবে দেখছে। দেশটির অর্থায়ন ও অবকাঠামো পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা ওই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। জাপানি কর্মকর্তারা মনে করছেন, মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের শিল্প ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে এর আগে ফেনী নদীর ওপর বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু নির্মাণ করা হয়। সেতুটি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল ও মাতারবাড়ির যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তবে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমানে সেতুটি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী জাপানি কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বাংলাদেশ হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা গেলে মাতারবাড়ি বন্দরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছিল, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ৪ দিনের সফরে জাপান যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সফরের দ্বিপক্ষীয় আলোচ্যসূচিতে ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ’ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
সময়ের আলো/মহু