ছবি : সংগৃহীত চলতি মাসেই বাড়তি বেতন পেতে শুরু করবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো করা হলেও সরকারি চাকরিজীবীরা আপাতত আগের হারেই তাদের ভাতা পাবেন। অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ জুন তারা যে হারে ভাতা পেতেন, পরের আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত সে হারেই ভাতা পেতে থাকবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সোমবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফতর, সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য প্রজ্ঞাপনটি প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ সূত্র নিশ্চিত করেছে, চলতি মাসের শেষেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতন হাতে পাবেন এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ইতিমধ্যে রাখা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের ২০২৬ সালের বেতন ও ভাতাদি আদেশে নির্ধারিত মূল বেতন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত মূল বেতনের শতকরা হারে ভাতা দেওয়ার বিধান করেছে সরকার। বেতন ও ভাতাদি আদেশের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল ঠিক এক মাস আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর। অবশ্য নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী ভাতা যে পরে দেওয়া হবে, সে ঘোষণা আগেই দিয়েছে সরকার।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের পুরো বর্ধিত বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বেতন-ভাতা দেওয়া হবে।
গত ১ জুলাই থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর প্রথম ধাপ, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপ এবং ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় ধাপে দেওয়া হবে মূল বেতন। ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন অনলাইনে নির্ধারণ করার কাজ চলছে, যা মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা। এ জন্য ৫ অক্টোবর থেকে সরকারের আইবাস প্লাস প্লাসের ‘পে ফিক্সেশন’ অপশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করছেন সরকারি কর্মচারীরা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাস শেষে সরকারি কর্মচারীরা বাড়তি হারে বেতন পাবেন। এ জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা আছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রচলিত ভাতা নির্ধারণ হবে যেভাবে
সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এর আওতাবহির্ভূত মূল বেতনের শতাংশভিত্তিক প্রচলিত ভাতাগুলো আপাতত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে নির্ধারণ ও পরিশোধ করা হবে।
পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিয়ম কার্যকর থাকবে। গেজেটে বলা হয়, নতুন বেতনস্কেল একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধির হার আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বেতন স্কেলে নির্ধারিত বেতন এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত বা প্রাপ্য বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্বদের এবং ৫০ শতাংশ দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেওয়া হবে।
পরবর্তী ধাপে ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্বদের ক্ষেত্রে ওই পার্থক্যের ৭০ শতাংশ এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ দেওয়া হবে। এরপর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন শতভাগ দেওয়া হবে।
গ্রেড ১ থেকে ৪
নতুন কাঠামো অনুযায়ী গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
গ্রেড-২-এর আগের বেতন ৬৬ হাজার টাকা থেকে শুরু হলেও নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা দিয়ে। এ গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন নতুন কাঠামোয় ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা।
গ্রেড-৩-এর আগের বেতন ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৭৪ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে এ গ্রেডের বেতন ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
গ্রেড-৪-এর আগের বেতন ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু। নতুন স্কেলে তা ১ লাখ টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
গ্রেড ৫ থেকে ৮
গ্রেড-৫-এর আগের বেতন ৪৩ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ৮৬ হাজার টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ধাপ ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা।
গ্রেড-৬-এর আগের বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হলেও নতুন স্কেলে শুরু হবে ৭১ হাজার টাকা দিয়ে। এ স্কেলের সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
গ্রেড-৭-এর আগের বেতন ২৯ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৬৩ হাজার ৪১০ টাকা। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ৫৮ হাজার টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা।
গ্রেড-৮-এর আগের বেতন ২৩ হাজার টাকা থেকে শুরু। নতুন স্কেলে এ গ্রেডের বেতন ৪৬ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ১০ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত।
গ্রেড ৯ থেকে ১২
গ্রেড-৯-এর আগের বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ৪৪ হাজার টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ধাপ ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা। গ্রেড-১০-এর আগের বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু হলেও নতুন স্কেলে তা বেড়ে ৩২ হাজার টাকা থেকে শুরু হচ্ছে। সর্বোচ্চ বেতন হবে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা।
গ্রেড-১১-এর আগের বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ৩০ হাজার ২৩০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা।
গ্রেড-১২-এর আগের বেতন ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে শুরু। নতুন স্কেলে তা ২৪ হাজার ৩০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
গ্রেড ১৩ থেকে ১৬
গ্রেড-১৩-এর আগের বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫৮ হাজার টাকা।
গ্রেড-১৪-এর আগের বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা।
গ্রেড-১৫-এর আগের বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২৩ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে তা ২২ হাজার ৮০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
গ্রেড-১৬-এর আগের বেতন ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে শুরু। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা।
গ্রেড ১৭ থেকে ২০
গ্রেড-১৭-এর আগের বেতন ৯ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে ২১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২১ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ৫১ হাজার ৯০০ টাকা।
গ্রেড-১৮-এর আগের বেতন ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে শুরু। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২১ হাজার টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা।
গ্রেড-১৯-এর আগের বেতন ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২০ হাজার ৫৭০ টাকা পর্যন্ত। নতুন স্কেলে শুরু হচ্ছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে এবং সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা।
সবশেষে গ্রেড-২০-এর আগের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২০ হাজার ১০ টাকা পর্যন্ত ছিল। নতুন স্কেলে এ গ্রেডের বেতন ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেভাবে নতুন বেতন নির্ধারণ হবে
গেজেটে বলা হয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বা তার আগে কোনো কর্মচারী যে মূল স্কেল, উচ্চতর গ্রেড বা অন্য কোনো গ্রেড/স্কেল পেতেন, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তার বিপরীতে নির্ধারিত নতুন অনুরূপ স্কেল প্রাপ্য হবেন।
কোনো কর্মচারী বর্তমান স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন পেলে নতুন স্কেলেরও প্রারম্ভিক ধাপে তার বেতন নির্ধারণ করা হবে। আর প্রারম্ভিক ধাপের চেয়ে বেশি বেতন পেলে বর্তমান বেতন ও সংশ্লিষ্ট স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপের পার্থক্য বের করে তা নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করা হবে। যোগফল নতুন স্কেলের কোনো ধাপের সঙ্গে মিলে গেলে সেই ধাপে এবং কোনো ধাপের সঙ্গে না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।
গেজেটের উদাহরণে বলা হয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারীর মূল বেতন ৯ হাজার ৩০০ টাকা হলে ১ জুলাই থেকে সংশ্লিষ্ট নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ ২১ হাজার ৯০০ টাকা নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ নতুন বেতনস্কেলে শুধু প্রারম্ভিক বেতনই নয়, চাকরিজীবনের বিভিন্ন ধাপের বেতনও নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারিত হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি