ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন। ছবি : সময়ের আলোকুড়িগ্রামের রৌমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙনে এক সপ্তাহে অন্তত ২০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতবাড়ির পাশাপাশি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে বিঘার পর বিঘা আমন ধানের জমি, ভুট্টাখেত ও শাকসবজির আবাদ। ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় লোকসান এড়াতে কাঁচা-পাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অন্যের জমিতে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের খেদাইমারী ও সুখেরবাতি গ্রামে গত এক সপ্তাহ ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে প্রায় ২০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে নদীর ভাঙনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষি জমি ও ফসল।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনছার আলী জানান, গত এক সপ্তাহে তার ওয়ার্ডের সুখেরবাতি এলাকায় সাতটি এবং পাশের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে ১০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া চরে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করা আরও দুই ব্যক্তির বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। তাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ভাঙনে বসতভিটা হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সুখেরবাতি এলাকার প্রয়াত জুরান শেখের ছেলে দেলোয়ার, প্রয়াত নওশাদের ছেলে নজরুল ইসলাম, বাবু পাগলার ছেলে রুপচান, আশেক আলীর মেয়ে আয়শা খাতুন, প্রয়াত বুলু শেখের ছেলে ছোবহান ও গোলাপ ঠাকুরের ছেলে লালু শেখ।
অন্যদিকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন বুলা বয়াতির ছেলে কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, হাতেম, কদম আলী, কোরবান আলীর ছেলে আব্দুল খালেক, পিয়ার আলীর ছেলে মহর উদ্দিন, আব্দুস ছপুরের ছেলে সিরাজুল, প্রয়াত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলী এবং সোলায়মানের ছেলে আক্কাস আলী।
বসতভিটার সঙ্গে হারাচ্ছেন ফসলি জমিও
নদীভাঙনে শুধু বসতবাড়িই নয়, কৃষকদের বছরের পরিশ্রমে ফলানো ফসলও বিলীন হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আনছার আলী জানান, ওই এলাকার প্রয়াত মহেজ মোল্লার ছেলে ইউনুছ মোল্লার নদীতীরবর্তী দেড় বিঘা আমন ধানের জমি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে চলে গেছে। এ ছাড়া ছবুর প্রামাণিকের চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা আমন ধানের ক্ষেত নদীতে বিলীন হয়েছে।
একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রয়াত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলীর বসতভিটার পাশাপাশি তিন বিঘা ধানি জমিও নদীগর্ভে চলে গেছে বলে জানান তিনি।
জমসের আলী বলেন, আমাগো বাড়িভিটাসহ তিন বিঘা জমি নদীতে গেছে। অহন আমি কি করুম! ধারদেনা করি মানুষের জমিতে ঘর উঠাইছি। সরকারি-বেসরকারিভাবে কেউ সহযোগিতা করে নাই।
হঠাৎ ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছে। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ছয় থেকে সাত মাস আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ভাঙন প্রতিরোধে নদীতীরে জিও ব্যাগ ফেলেছিল। তবে সঠিক তদারকি ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে সেগুলোও নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে নদীর পাড় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে এবং ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান জানান, ইউনিয়নের খেদাইমারী, সোনাপুর ও সুখেরবাতি এলাকায় নদীভাঙন মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এসব এলাকায় ব্লক নির্মাণের কাজ না হওয়ায় শুধু জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিও ব্যাগগুলো নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় নদীর পাড় উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে আবাদি জমি, গাছপালা ও বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হচ্ছে।
ইউপি চেয়ারম্যান আরও জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সরকারি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। ফলে সর্বস্ব হারানো দরিদ্র পরিবারগুলোর নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ করার জন্য বর্তমানে কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। তবে স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই