ইউরোপের পর এবার কি আমেরিকা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অস্থিরতা চলছে। এর মধ্যে ফ্রান্স এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতির বিপজ্জনক

2026-10-20T22:29:21+00:00
2026-10-20T22:29:21+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইউরোপের পর এবার কি আমেরিকা?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৯ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অস্থিরতা চলছে। এর মধ্যে ফ্রান্স এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতির বিপজ্জনক মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ব্যয় করার কারণে ফ্রান্স এখন আর্থিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে। গত কয়েক মাসে বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক দ্রুত ঋণ পরিশোধের চাপ সামনে এসেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও এ পরিস্থিতিতে ভূমিকা রেখেছে। 

সম্ভাব্য সমাধানের অংশ হিসেবে কর বাড়ানো ও সরকারি ব্যয় কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় এসব সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে ক্ষুব্ধ জনসাধারণের অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, তীব্রভাবে বিভক্ত সরকারের মধ্যে বাজেট নিয়ে অনিশ্চিত লড়াই চলায় কার্যকর সমাধানে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। খবর সিএনএনের।

ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ছে ক্রমবর্ধমানসংখ্যক দেশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতির সঙ্গে এর মিল রয়েছে। দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণ, ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সমস্যা সমাধানে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব—পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতিতে এখন এই চিত্রই স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। তবে দেশগুলোর পরিস্থিতির মধ্যে এই মিলের অনেকটাই উপরিভাগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। ফ্রান্সের আর্থিক সংকট বিশেষভাবে তীব্র হলেও তা ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কম। ফ্রান্সের বিশাল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয়ের যে অংশ যায়, যুক্তরাষ্ট্রে তার তুলনায় অনেক কম ব্যয় হয়। তা ছাড়া মার্কিন অর্থনীতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে অদূর ভবিষ্যতে দেশটির ফ্রান্সের মতো সংকটে পড়ার আশঙ্কা নেই।

মূল সমস্যা

এসব সমস্যা নতুন নয়। ইউরোপের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা কয়েক দশক ধরেই একটি অসহনীয় আর্থিক পথে এগোচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও কয়েকজন রাজনীতিক বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন, একসময় এই ব্যয়ের বোঝা মেটানোর সময় আসবেই। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোর আর্থিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর সরকারি ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের গড় সুদের হার ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়েছে।

প্রায় ২০ বছরের মধ্যে এই হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি দশকের শেষ নাগাদ ওই সাত দেশের সম্মিলিত সরকারি ঋণের পরিমাণ তাদের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১১৯ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ। দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নীতিবিষয়ক অধ্যাপক পিটার টেলর-গুবি বলেন, ইউরোপে মানুষ ক্রমেই বন্ডবাজার এবং ঋণ নিতে সরকারকে যে সুদ দিতে হয়, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিষয়টি আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উপেক্ষা করলে গুরুতর সংকট তৈরি হবে।

মার্কিন পরিস্থিতি

কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতিও খুব একটা আলাদা নয়। দেশটির ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি ঋণ বার্ষিক জিডিপির প্রায় সমান। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশটির বাজেট ঘাটতি ছিল ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি।

সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ব্যয় সম্প্রতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশটির মোট কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে এ খাতে। অর্থাৎ কর থেকে পাওয়া প্রতি সাত ডলারের এক ডলারই খরচ হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।

তবে ইউরোপে সরকারি ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানো নিয়ে যে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রে তা অনেক কম। প্রশ্ন হলো, তাহলে ফ্রান্সের মতো একই সমস্যায় পড়ছে না কেন যুক্তরাষ্ট্র?


কেন এখনই যুক্তরাষ্ট্রে একই পরিস্থিতি তৈরি হবে না

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। বিশ্বের অধিকাংশ লেনদেনই ডলারে সম্পন্ন হয়। তেল ও সোনার মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের লেনদেনেও ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

ডলারের চাহিদা এখনো শক্তিশালী। এর বড় কারণ, মুদ্রাটিকে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার ডলারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যদিও গত এক দশকে মুদ্রাটির সেই আকর্ষণে কিছুটা ভাটা পড়েছে।

এ কারণেই মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের চাহিদাও বেশি। এসব বন্ডকে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগগুলোর অন্যতম বলে মনে করা হয়। বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ডের বাজারে যখন বিক্রির চাপ চলছে, তখনও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডের সুদের হার অন্যান্য পশ্চিমা অর্থনীতির তুলনায় কম রয়েছে।

গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে দরপতনের সময়ও বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দিকে ঝুঁকেছেন। এতে বন্ডের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তবে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্যের মূল কারণ একটি বিষয়েই নিহিত। মার্কিন রাজনৈতিক কৌশলবিদ জেমস কারভিলের বিখ্যাত উক্তি ধার করে বলা যায়, ‘আসল বিষয় অর্থনীতি, বোকা!’ 

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি একই সঙ্গে বড় ও বৈচিত্র্যময়। ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বিভিন্ন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দেশটির বেশি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক উত্থান মার্কিন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। অথচ অর্থনীতির আরও কয়েকটি খাতে স্থবিরতা কিংবা পতনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

বাজেট ঘাটতির গুরুত্ব কমানোর অন্যতম উপায় হলো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী রাখা। অর্থনীতি বড় হলে তার তুলনায় ঋণের বোঝা কম ভারী বলে মনে হয়।

তাই দেশগুলোর নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন, ঋণের বিপরীতে তাদের কত সুদ দিতে হচ্ছে? প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।

মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি বলেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি প্রায় একই রকম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের কারণে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। ফলে দেশটি তার ঋণ সামলাতে এবং সংকট মোকাবিলা করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হবে।

অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন ঋণসংকটের আশঙ্কা কম বলে একে আর্থিক দায়িত্বশীলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্যের তুলনায় দেশটির সমস্যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বেশি— বিষয়টি এমনই।

জান্ডি আরও বলেন, এর অর্থ এই নয় যে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা যায়। বরং যুক্তরাষ্ট্র কেবল ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে।

সংকট কি অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে?

ইউরোপের কোনো দেশ আর্থিক সংকটে পড়লেই তা মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ মনে করেন, ফ্রান্সের সমস্যা আপাতত দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ইঙ্গিত দিয়েছে, ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতিতে তাদের হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন হবে না। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহামের মতে, সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে সদস্য দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ বন্ড কেনার মতো সক্ষমতাও ইসিবির রয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের বাজেট ঘাটতিও ফ্রান্সের তুলনায় অনেক কম। চলতি বছর কয়েকটি দেশের বাজেটে উদ্বৃত্ত থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের বাম ও ডান—উভয় ধারার রাজনৈতিক দলই ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা অতি ডানপন্থি প্রার্থী মেরিন লে পেনও।

একসময় তিনি ‘ফ্রেক্সিট’— অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ফ্রান্সের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালালেও পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। জার্মানির অতি ডানপন্থি দল এএফডি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও এখনো তাদের সরকার গঠনের কাছাকাছি পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন কেনিংহাম।

তবে ফ্রান্সের বাইরেও ঋণসংকট তৈরি হওয়ার পেছনে একটি অনিশ্চিত বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্স ডেট’ বা ঋণসীমায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময়।

আগামী বছরের কোনো একসময়ে যুক্তরাষ্ট্র আবারও আইননির্ধারিত ঋণসীমায় পৌঁছে যেতে পারে। তখন নতুন কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঋণসীমা বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

কিন্তু মেয়াদের শেষ পর্যায়ে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট এবং সম্ভাব্যভাবে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যে এই সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ছাড় দিতে কম আগ্রহী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

ঋণসীমা বাড়াতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের ঋণ পরিশোধে খেলাপি হওয়ার পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে, যদিও অন্যথায় ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য দেশটির রয়েছে।

মার্ক জান্ডি বলেন, এমন একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা যায়, যেখানে আগামী বছরের হ্যালোইনের সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ঋণসীমা অতিক্রম করে ফেলবে। এরপর আরও কিছু সমস্যা দেখা দেবে।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ 




  বিষয়:   ইউরোপ  আমেরিকা 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: