অভিযুক্ত মোজাম্মেল হক মোজা। ছবি : সংগৃহীত ঢাকার ধামরাইয়ে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় পণ্য লোড-আনলোডের কাজকে কেন্দ্র করে অবৈধভাবে বকশিশের নামে চাঁদা দাবি, ট্রাকচালকদের মারধর এবং নতুন ভেন্ডরের কর্মীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোজাম্মেল হক মোজা নামে বিএনপির এক নেতা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং বিপুল আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার এই ঘটনায় শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার, ধামরাই থানা ও ঢাকা- ২০ আসনের সংসদ সদস্য তমিজ উদ্দিনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
অভিযুক্তরা হলেন- ধামরাই উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক মোজা, ধামরাইয়ের গাংগুটিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ঈমান আলী, যুবলীগ নেতা মামুন। মোজাম্মেল হক মোজা এম এম এন্টারপ্রাইজের নামে কারখানাটিতে লোড-আনলোডের কাজের ঠিকাদার।
আকিজ গ্রুপের করা লিখিত অভিযোগে, এ অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আবেদনে কারখানার গেটে শিল্প পুলিশের একটি দল মোতায়েন করে টহল দেওয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ দেশের একটি স্বনামধন্য খাদ্য ও পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও শিল্পোৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কারখানায় উৎপাদিত পণ্য যথাসময়ে লোড-আনলোড ও সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন করা জরুরি।
কারখানার পণ্য লোড-আনলোডের দায়িত্বে থাকা মেসার্স এম এম এন্টারপ্রাইজের কয়েকজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পণ্যবাহী গাড়ির চালকদের কাছ থেকে অননুমোদিতভাবে বকশিশ ও চাঁদা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চালকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের একাধিকবার সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে দাবি কারখানা কর্তৃপক্ষের।
আবেদনে আরও বলা হয়, সম্প্রতি একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মেসার্স এম এম এন্টারপ্রাইজের কোনো শ্রমিক পণ্যবাহী গাড়ির চালকদের কাছ থেকে অননুমোদিতভাবে বকশিশ বা অন্য কোনো অর্থ নিতে পারবেন না। এরপর সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে কারখানার বাইরে চলে যান। পরে কাজে ফিরে এলেও তাঁরা এক-তৃতীয়াংশ লোকবল নিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ করতে থাকেন। এতে কারখানার পণ্য লোড-আনলোড ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয় বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
নতুন ভেন্ডরের কর্মীদের হুমকির অভিযোগ
কারখানার পণ্য লোড-আনলোড কার্যক্রম স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কর্তৃপক্ষ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নতুন ভেন্ডর নিয়োগ করে। তবে মেসার্স এম এম এন্টারপ্রাইজের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নতুন ভেন্ডরকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন এবং কেবল তাঁদের মাধ্যমেই কাজ পরিচালনার দাবি জানাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নতুন ভেন্ডরের কর্মীদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট লোডার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নতুন ভেন্ডরকে বাদ দেওয়ার শর্তে তাদের লোকজন পুনরায় কাজ করবেন বলে জানানো হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, এ ধরনের অবস্থানের কারণে পণ্য সরবরাহ ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সুনাম ও সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কারখানার গেটে অবস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করছেন। রাতে বা পরদিন সকালে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করার চেষ্টা করা হতে পারে বলে একটি সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়ার কথাও আবেদনে জানানো হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেটে শিল্প পুলিশের একটি দল মোতায়েন করে টহল দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আবেদনে মেসার্স এম এম এন্টারপ্রাইজের মালিক মোজাম্মেল হক, ইউপি সদস্য ঈমান আলী এবং স্থানীয় যুবলীগের নেতা মামুনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় যুবদলের একজন নেতার সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ওই নেতার নাম ও পরিচয় তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করার কথা আবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষের আবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কর্মকাণ্ডে ইন্ধন জোগাচ্ছেন বা তাঁদের সমর্থন দিচ্ছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
তদন্ত ও নিরাপত্তা চেয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ
শিল্প পুলিশের কাছে পাঠানো আবেদনে ছয় দফা দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, পণ্যবাহী গাড়ির চালক ও পরিবহণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন ভেন্ডরের কর্মীদের হুমকি ও কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা।
এ ছাড়া কারখানার প্রবেশপথ, পণ্য লোড-আনলোড এলাকা ও পরিবহন কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে কারখানার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বা পণ্য পরিবহন ব্যাহত করার চেষ্টা প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনার তারিখ ও বিবরণ-সংবলিত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শী বা ভুক্তভোগী চালকদের লিখিত বক্তব্য, হুমকি, মারধর বা কাজে বাধা দেওয়ার ছবি-ভিডিওসহ অন্যান্য প্রমাণ এবং প্রাসঙ্গিক চুক্তিপত্র ও যোগাযোগের অনুলিপি সংযুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনের অনুলিপি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এবং আশুলিয়ার সংশ্লিষ্ট শিল্প পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজি, শ্রমিক বা চালকদের ওপর শারীরিক নিগ্রহের মতো অনভিপ্রেত ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার পরিপন্থি। একটি সুনির্দিষ্ট চক্রের অযৌক্তিক কর্মবিরতি ও ধীরগতির কারণে কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আমরা কারখানার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কর্মরত প্রত্যেকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। একই সঙ্গে উৎপাদন সচল রাখতে আইনানুগ পন্থায় বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ধামরাই উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক মোজা। তবে তিনি এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান বলেন, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কর্তৃপক্ষের একটি লিখিত আবেদন পাওয়া গেছে। একটি স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/আতা