প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম
টেম্বা বাভুমা। ছবি : সংগৃহীতদেখতে ছোটখাটো গড়নের, উচ্চতা মাত্র ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। ক্যারিয়ারে ফর্ম নিয়ে শুনতে হয়েছে সমালোচনা, দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে সাত বছরেরও বেশি সময়। এর সঙ্গে ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ টেস্ট অধিনায়ক হওয়ার বাড়তি চাপ। সব বাধা পেরিয়ে টেম্বা বাভুমার নেতৃত্বেই ২০২৫ সালে প্রথমবার বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে দক্ষিণ আফ্রিকা। এবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৭৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংসে আবারও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিলেন এই প্রোটিয়া অধিনায়ক।
বাভুমার সংগ্রামের শুরুটা বুঝতে ফিরে যেতে হয় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। নিজের ক্যারিয়ারের সপ্তম টেস্টে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কেপটাউনে ১০২ রানে অপরাজিত থেকে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তিনি। টেস্টে সেঞ্চুরি করা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটার হন বাভুমা। কিন্তু দ্বিতীয় শতকের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় সাত বছরেরও বেশি সময়। ২০২৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৭২ রান করে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটান।
দীর্ঘ বিরতির মধ্যেও দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ রান করেছেন, শুধু পাচ্ছিলেন না তিন অঙ্কের ম্যাজিকের দেখা। ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও পরিস্থিতি বুঝে খেলার ক্ষমতা তার ব্যাটিংয়ের বড় শক্তি। শারীরিক গড়নে তুলনামূলক ছোট হলেও গতিময় বোলিংয়ের সামনে কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে লড়াই করেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা গেছে। দ্বিতীয় সেঞ্চুরির পর আর এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালেও পেয়েছেন শতকের দেখা। আর এবার তো রেকর্ডও করলেন এই অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি বয়সি অধিনায়ক হিসেবে শতক। ভেঙেছেন ভারতের রোহিত শর্মার রেকর্ড। গ্যাবারা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম অধিনায়ক হিসেবে লাল বলে সেঞ্চুরি করলেন বাভুমা। এর আগে ১৯৯২ সালে এই ভেন্যুতে ভারতের বিপক্ষে কেপলার ওয়েসেলসের করা ৯২ রান প্রোটিয়া অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ছিল।
শুধু ব্যাটিং নয়, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও কঠিন দায়িত্ব সামলাতে হয়েছে তাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে তার ভূমিকা ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরেও প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কুইন্টন ডি ককের বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংহতি প্রকাশে অংশ না নেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে পরিস্থিতি সামলাতে হয় বাভুমাকে। পরে ডি কক তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
বাভুমার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় অর্জন আসে ২০২৫ সালের জুনে। লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে পাঁচ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে দক্ষিণ আফ্রিকা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটানো এই জয় অধিনায়ক হিসেবে বাভুমার অবস্থান আরও দৃঢ় করে। একই সঙ্গে বড় মঞ্চে দলকে সাফল্য এনে দেওয়ার সামর্থ্যও প্রমাণ করেন তিনি।
সেই সাফল্যের পরও নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হন বাভুমা। গ্যাবারা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে মাত্র ৪০ রানে চার উইকেট হারায় দক্ষিণ আফ্রিকা। মেঘলা আকাশ, প্রতিকূল উইকেট আর প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোল্যান্ডের মতো পেসারদের সামলে দলের হাল ধরেন বাভুমা। তার ১৭৯ রানের ইনিংসে ভর করে ৪২৫ রানে ইনিংস ঘোষণা করে দক্ষিণ আফ্রিকা। নিজের ইনিংস নিয়ে বাভুমা বলেন, ‘আমি এমন পরিস্থিতিতে অনেকবার পড়েছি। মনে হয়, এসব পরিস্থিতিতেই আমার সেরাটা বেরিয়ে আসে। শুরু থেকেই আমি নিজের কাজে মনোযোগ দিয়েছি।’
দীর্ঘ অপেক্ষা, অধিনায়কত্বের চাপ ও কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন বাভুমা। তার ব্যাটিং হয়তো সব সময় আগ্রাসী নয়, তবে সংকটের মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে। তার গল্প তাই শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের নয়; প্রতিকূলতা পেরিয়ে দলকে ইতিহাসের চূড়ায় তুলে নেওয়ারও।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে