সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। ছবি : সময়ের আলোচাকরিচ্যুত এক র্যাব সদস্যের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল এক সক্রিয় ও দুর্ধর্ষ অপহরণকারী চক্র। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি)-এর ভুয়া পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রাখা এবং মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল তাদের প্রধান কৌশল। অবশেষে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের টানা অভিযান ও কৌশলগত কৌশলে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অপহৃত এক হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী উদ্ধার হয়েছেন। একই সঙ্গে চক্রের মূল হোতাসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। এর আগে ২১ অক্টোবর ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফ লেদা ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে উদ্ধার করে পুলিশ।
গ্রেফতাররা হলেন, কক্সবাজারের উখিয়ায় কর্মরত অবস্থায় নানা অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে চাকরিচ্যুত ও বরখাস্ত হওয়া সাবেক র্যাব সদস্য সুমন মুন্সি (গোপালগঞ্জ), মিজানুর রহমান (কুতুবদিয়া), জয়নাল উদ্দিন (উখিয়া), মো. আব্বাস উদ্দিন (বাঁশখালী), রোহিঙ্গা মো. ছলিম ওরফে সেলিম (টেকনাফ) এবং দেলোয়ার হোসেন (কক্সবাজার সদর)। আসামিদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত প্রাইভেট কার, ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো কটি, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ (হাতকড়া) জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র ও সংবাদ সম্মেলনের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নিজ মালিকানাধীন ‘মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ’ থেকে ব্যবসায়ী হাসানকে এসআরবি-র পরিচয় দিয়ে ও ভুয়া মামলার ভয় দেখিয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তুলে নিয়ে যায় চক্রটি। পরবর্তীতে তাকে কক্সবাজারের টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে শিকল পরিয়ে বন্দি রাখা হয়।
অপহরণের দুই ঘণ্টা পর থেকে ভিওআইপি নাম্বারের মাধ্যমে অপহৃতের পরিবার ও ক্যাশিয়ারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা শুরু হয় এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনা তদন্তে নেমে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সিএনজি ও মাইক্রোবাসের গতিপথ শনাক্ত করে। এরপর প্রথমে জয়নাল উদ্দিন জুনু নামে এক আসামিকে গ্রেফতারের পর ফাঁদ পেতে চক্রের হোতা সুমন মুন্সিকে তার প্রাইভেট কারসহ কক্সবাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃতদের দিয়ে কৌশল খাটিয়ে ফোন করানো হয়—মুক্তিপণের পুরো টাকা পাওয়া গেছে এবং ভিকটিমকে বাইরে নিয়ে আসতে বলা হয়। অপহরণকারীরা ব্যবসায়ী হাসানকে চোখ-মুখ বাঁধা অবস্থায় ক্যাম্পের গেটে নিয়ে এলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।
সংবাদ সম্মেলনে উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ী হাসান কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন। তিনি জানান, তাকে পাঁচ দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়েছিল, পায়ে শিকল বেঁধে বেদম মারধর করা হয়েছিল এবং পেটে অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, চক্রের মূল হোতা সুমন মুন্সি ২০২১ সালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য চাকরিচ্যুত হন। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই ১৩টি মামলা রয়েছে। জেলে থাকা অবস্থায় ও উখিয়ায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও স্থানীয় অপরাধীদের নিয়ে তিনি এই ‘ভুয়া এসআরবি’ গ্যাং গড়ে তুলেছিলেন।
সময়ের আলো/জোই