হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ছবি : সংগৃহীতহযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বছরের পর বছর পড়ে আছে তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ। এসব উড়োজাহাজ সরাতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিক্রির দর নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছে না বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। অন্যদিকে উড়োজাহাজগুলো বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে থাকায় নতুন পার্কিং বে নির্মাণ ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে উড়োজাহাজগুলো অপসারণ নিয়ে জটিলতায় পড়েছে সংস্থাটি।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরের রফতানি কার্গো ভবন এলাকায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজগুলো পড়ে রয়েছে। গত ১২ বছরে এই ১২টি উড়োজাহাজের পার্কিং ও সারচার্জ বাবদ বকেয়া প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ বকেয়া জিএমজি এয়ারলাইন্সের। জিএমজির কাছে ৩৬০ কোটি টাকার বেশি পায় বেবিচক। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট স্থগিত করে জিএমজি এয়ারলাইন্স। এরপর আর কখনো আকাশে ডানা মেলেনি।
এগুলো সরিয়ে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সর্বোচ্চ দর উঠেছে ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। করসহ প্রস্তাবিত মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তবে উড়োজাহাজগুলো সরানো গেলে দখলমুক্ত জায়গায় নতুন করে প্রায় ১২টি পার্কিং বে নির্মাণ করা সম্ভব। এতে বিমানবন্দরের কার্যক্রমের পরিসর বাড়ার পাশাপাশি রাজস্ব আয়েরও সুযোগ তৈরি হবে।
উড়োজাহাজগুলো বিক্রির জন্য আগ্রহী তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস, সেনা কল্যাণ সংস্থা এবং সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেড। এর মধ্যে এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেস সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার দর দিয়েছে। সেনা কল্যাণ সংস্থার প্রস্তাব ৩ কোটি ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, কর ছাড়া। অন্যদিকে সেফ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন লিমিটেডের প্রস্তাব ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার।
প্রথমে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে উড়োজাহাজগুলো বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিমান মন্ত্রণালয় আপত্তি জানিয়ে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেয়। পরে বেবিচকের ৩২০তম বোর্ড সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। চলতি বছরের ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সভায় সর্বোচ্চ দরদাতার প্রস্তাবকে ভিত্তি ধরে নিলামের প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এরোপোরিয়া অ্যারোস্পেসের দেওয়া ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারকে ভিত্তিমূল্য ধরে অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বেবিচক।
আইনি জটিলতায় আটকে অপসারণ : বেবিচক সূত্র জানায়, উড়োজাহাজগুলোর উড্ডয়নযোগ্যতার সনদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিধিবিধান অনুসরণ করে নিবন্ধন বাতিল করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে একাধিকবার নোটিস দিয়ে উড়োজাহাজ সরিয়ে নিতে বলা হলেও তারা তা করেনি। পরে চূড়ান্ত নোটিস, কমিটির সুপারিশ এবং আইনগত বিষয় পর্যালোচনা করে এগুলো বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০২৪ সালের ২৬ মে উড়োজাহাজগুলো বাজেয়াপ্তের আদেশ জারি করা হয়। একই বছরের ১ জুন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স, ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককেও বিষয়টি জানানো হয়। তবে উড়োজাহাজগুলোর মালিকানা ও ঋণের দায় নিয়ে পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
আইনি মতামত অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্তের আদেশ বাতিল চেয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ অর্থঋণ আদালতে আবেদন করে। এ সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে আটকে রয়েছে। ফলে উড়োজাহাজগুলো বিক্রি ও অপসারণের প্রক্রিয়ায় আইনগত বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আমরা ৩০০ কোটি টাকা সারচার্জ মওকুফের জন্য আবেদন করেছিলাম। আর মূল বকেয়া ৫৫ কোটি টাকা এয়ারলাইন্স চালু হওয়ার পর ক্রমান্বয়ে দেব বলেছিলাম। এ প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্মতি দেয়নি। ফলে এয়ারলাইন্স পরিচালনায় এওসি নবায়ন করতে পারিনি। এখন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
উড়োজাহাজগুলো জায়গা দখল করে আছে এগুলো খালি করা দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেবিচক এগুলো বিক্রি করলে ১০০ ভাগের ১ ভাগ দামও পাবে না। এয়ারলাইন্সগুলো চেয়েছিল এগুলো বিক্রি করতে, তাতে তারা কিছু টাকা পেত, বেবিচকের পাওনাও কিছু দিতে পারত। বেবিচক এ বিষয়ে নীতিগতভাবে রাজি হয়নি। এগুলো পুরোনো হলেও এগুলোর রিসেল দাম আছে। বেবিচক সেভাবে করতে পারবে না। এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যাংকে লোন থাকায় ব্যাংক এগুলো বিক্রির অনুমতি দেবে না। এখানে আইনগত ঝামেলা রয়েছে।
অন্যদিকে উড়োজাহাজগুলোর কারণে বিমানবন্দরের বড় একটি জায়গা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, আনুষঙ্গিক সরঞ্জামসহ প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় জায়গার সংকটের কারণে উড়োজাহাজ পার্কিং, কার্গো ওঠানামা ও যানবাহন চলাচলে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বেবিচক কর্মকর্তাদের মতে, উড়োজাহাজগুলো সরানো গেলে ওই জায়গায় আনুমানিক ১২টি নতুন পার্কিং বে তৈরি করা সম্ভব। এসব বে ব্যবহার করে উড়োজাহাজের অবতরণ, রুট নেভিগেশন এবং রাতের অবতরণ ও উড্ডয়নসহ বিভিন্ন সেবার বিপরীতে আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে শুধু উড়োজাহাজ বিক্রির অর্থ নয়, জায়গাটি কাজে লাগাতে না পারার কারণেও রাজস্বের সম্ভাবনা হারাচ্ছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি মতামত দেওয়া হয়েছে। সেখানে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ আপাতত বেবিচকের পৃথক হিসাবে জমা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এখন প্যানেল আইনজীবীর চূড়ান্ত মতামত এবং মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর পরবর্তী কার্যক্রম নির্ভর করছে।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান সময়ের আলোকে বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা একটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/কেএইচও