সুযোগ থাকলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ

রফিক রাফি, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে ফিরে

জাতীয়

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের খাল ও নদীপথ এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য। শহরের ব্যস্ত সড়কের যানজট এড়িয়ে

2026-10-24T00:41:45+00:00
2026-10-24T00:41:45+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
সুযোগ থাকলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ
পর্যটক টানছে থাইল্যান্ডের নৌপথ-খাল
রফিক রাফি, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে ফিরে
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪১ এএম 
ব্যাংককের একটি খালে পর্যটকবাহী নৌযান। ছবি : ব্যাংকক পোস্ট
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের খাল ও নদীপথ এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য। শহরের ব্যস্ত সড়কের যানজট এড়িয়ে দ্রুত চলাচলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ব্যবহার করেন এসব জলপথ। খালের ওপর দিয়ে চলে যাত্রীবাহী নৌযান, কোথাও ডিজেলচালিত, কোথাও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎচালিত বোট। খালের দুই পাশে তৈরি হয়েছে হাঁটার পথ, যাত্রী ওঠানামার জন্য রয়েছে নির্ধারিত ঘাট। ফলে নগর পরিবহন, পর্যটন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্যাংককের জলপথ।

অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার চারপাশে নদী-খাল থাকলেও দূষণ, দখল, ভরাট এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব জলপথের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। যানজট নিরসন, যাত্রী পরিবহন ও পর্যটন বিকাশে নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। 

সম্প্রতি ঢাকার চারপাশের নৌপথ সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিদ্যুৎচালিত ওয়াটার বাস চালুর পরিকল্পনা আটকে আছে বেসরকারি উদ্যোক্তার অভাবে।

খালেই গণপরিবহন, পর্যটকদেরও আকর্ষণ : ব্যাংককের স্থানীয় ভাষায় খালকে বলা হয় ‘খলং’। শহরটির বিভিন্ন খাল দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে যাত্রীবাহী নৌযান। এর মধ্যে ‘ক্লং সায়েন সায়েপ এক্সপ্রেস বোট’ অন্যতম ব্যস্ত নৌসেবা। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে ২৭টি ঘাট রয়েছে। প্রাতুনাম, সেন্ট্রাল ওয়ার্ল্ড, এমবিকে ও নানা এলাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার সঙ্গে এই নৌপথের সংযোগ রয়েছে। ব্যাংককের সড়কে যখন যানজট তীব্র হয়, তখন নৌপথে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া সাধারণত ৮ থেকে ২০ বাথ। কম খরচে দ্রুত চলাচলের সুবিধায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় এই সেবা।

গেল সপ্তাহে সরেজমিন ব্যাংককের নানা স্টেশন থেকে প্রাতুনাম পর্যন্ত নৌপথে দেখা যায়, প্রতিটি বোটেই যাত্রীদের এরপর উল্লেখযোগ্য ভিড়। এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে যেতে সময় লাগে প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিট। বোটগুলো ঘাটে অল্প সময়ের জন্য থামে। যাত্রীরা দ্রুত ওঠানামা করে। সকাল ও বিকালে অফিসগামী মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের চাপে ভিড় আরও বাড়ে।

বোটের মাঝখানে যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা রয়েছে। দুই পাশে পানি ছিটকে পড়া ঠেকাতে নীল রঙের পর্দা ব্যবহার করা হয়। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে এই নৌসেবা। তবে খালের পানি পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। অর্থাৎ পানির মানে ঘাটতি থাকলেও নিয়মিত নৌপরিবহন চালু রেখে জলপথকে যাতায়াতের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে ব্যাংকক।

বিদ্যুৎচালিত বোটে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত : ব্যাংককের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো বিদ্যুৎচালিত শাটল বোট। ‘ক্লং ফাদুং ক্রং কাসেম’ জলপথে হুয়া লামফং রেলস্টেশন থেকে পুরোনো শহরের ফ্রা সুমেন ফোর্ট পর্যন্ত এসব বোট চলাচল করে। এই পথে রয়েছে ১৪টি ঘাট। স্থানীয় প্রশাসন ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত এ ধরনের সেবায় শব্দ ও বায়ুদূষণ কমানোর পাশাপাশি জলপথকে নগর পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

রুটভেদে এসব বোটের আসনসংখ্যা ভিন্ন। ছোট বোটে ছয় থেকে আটজন এবং বড় বোটে ৩০ থেকে ৪০ জন পর্যন্ত যাত্রী চলাচল করতে পারেন। কিছু বোটে হুইলচেয়ার ব্যবহারের সুবিধাও রয়েছে। বোটের ছাদে সৌর প্যানেল এবং ঘাটে চার্জিং ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হচ্ছে।

শুধু খাল নয়, ব্যাংককের প্রধান নদী চাও ফ্রায়াতেও রয়েছে ‘চাও ফ্রায়া এক্সপ্রেস বোট’ নামে জনপ্রিয় যাত্রীসেবা। নদীর দুই পাড়ের বিভিন্ন ঘাটকে যুক্ত করা এই নৌপথে যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যটকরা শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নদীতীরের দৃশ্য উপভোগ করেন। রুট ও দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া ভিন্ন হয়।

খালপাড়ে হাঁটার পথ, বদলাচ্ছে নগরের চেহারা : ব্যাংকক খালকে শুধু নৌযান চলাচলের জন্য ব্যবহার করছে না; খালপাড়কে মানুষের চলাচল ও বিনোদনের উপযোগী করে তুলতেও উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় খালের দুই পাশে তৈরি হয়েছে ওয়াকওয়ে, বসার জায়গা ও সবুজ পরিসর। ফলে সড়কের ভিড় এড়িয়ে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চং ননসি ক্যানাল পার্কের মতো প্রকল্পে খালপাড়কে হাঁটার পথ ও উন্মুক্ত পরিসরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি খালের পানি ও পরিবেশের মানোন্নয়নে বর্জ্য অপসারণ, পানি শোধন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। এসব ব্যবস্থার ফলে জলপথ ঘিরে নগরজীবন, বিনোদন ও পর্যটনের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে ব্যাংককের সব খালই পরিচ্ছন্ন বা দূষণমুক্ত নয়। 

অনেক জলপথে পানির মানোন্নয়ন এখনও প্রয়োজন। তারপরও নৌপরিবহন, খালপাড়ের অবকাঠামো ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করার চেষ্টা শহরটির জলপথকে কার্যকর রাখছে।

সম্ভাবনা থাকলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ : বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার চারপাশেও নদী ও খালের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে যাত্রী পরিবহন, পর্যটন এবং পণ্য পরিবহনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দখল, দূষণ, নাব্যতা সংকট এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এসব জলপথের ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়েছে।

ঢাকার যানজট কমাতে নদীপথ ও খালকে গণপরিবহনের আওতায় আনার আলোচনা দীর্ঘদিনের। বর্তমান সরকারও ঢাকার চারপাশের নৌপথ দ্রুত সচল করার নির্দেশনা দিয়েছে। বিদ্যুৎচালিত ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তারা আগ্রহ প্রকাশ করেনি।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, ঢাকার চারপাশের নৌপথে বিদ্যুৎচালিত নৌযান চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখালে আমরা তাদের সহযোগিতা করব।

তিনি বলেন, আপাতত সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩০ আসনের ছোট ডিজেলচালিত নৌযান চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনকে (বিআইডব্লিউটিসি) প্রস্তাবনা জমা দিতে বলা হয়েছে।

সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন : ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ বলেন, জলপথকে কার্যকর করতে শুধু নৌযান চালু করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত যাত্রীসেবা, নির্ধারিত ঘাট, সহজে ওঠানামার ব্যবস্থা, সাশ্রয়ী ভাড়া এবং নৌপথের সঙ্গে সড়ক ও অন্যান্য গণপরিবহনের সংযোগ। একই সঙ্গে খাল ও নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুই পাড়ে নিরাপদ হাঁটার পথ তৈরি করাও জরুরি।

তিনি বলেন, ঢাকায় এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে যানজটের চাপ কমানোর পাশাপাশি নগরবাসীর যাতায়াত সহজ হতে পারে। নদী ও খাল ঘিরে গড়ে উঠতে পারে নতুন পর্যটনকেন্দ্র, তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ব্যাংকক জলপথকে নগর পরিবহন ও পর্যটনের অংশ করেছে। বাংলাদেশের সামনেও রয়েছে একই সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে জরুরি কার্যকর উদ্যোগ। আর এর জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   সুযোগ  পিছিয়ে বাংলাদেশ  পর্যটক  থাইল্যান্ড  নৌপথ  খাল 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: