প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীতজাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৩ দিনের সফরে টোকিও যাচ্ছেন। আজ রোববার রাত ১২টার পর প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা থেকে টোকিও যাত্রার কথা রয়েছে। ২৭ অক্টোবর টোকিওতে দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এই সফরে ঢাকার পক্ষ থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও মানবসম্পদ গুরুত্ব পেতে পারে। অন্যদিকে টোকিওর পক্ষ থেকে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার আভাস পাওয়া গেছে। আসন্ন এই সফরে উভয়পক্ষের মধ্যে কমবেশি ৬টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল করার জন্য ঢাকা-টোকিওর কূটনীতিকরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন। জাপান সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বৈঠকে অংশগ্রহণ ছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করবেন বলে প্রাথমিকভাবে সফরসূচি নির্ধারিত হয়েছে।
সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করবেন।
অন্যান্য সম্ভাব্য বৈঠক ও কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) চেয়ারম্যান, জাইকার প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সভাপতি, সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক, জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য প্রদান ও জাপানের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক প্রভৃতি।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুৎসু সিটি, চিবাতে এলএনজি টার্মিনাল এবং পাওয়ার প্লান্ট, ইউনিক্লো কোম্পানির হেডকোয়ার্টার এবং নাগোয়াতে টয়োটার কারখানা পরিদর্শন করবেন বলে সফরসূচি প্রস্তুত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব আরও জানান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ পর্যায়ে বিদ্যমান, যার আওতায় বাংলাদেশে অবকাঠামোগত স্থাপনা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং আরও কার্যক্রমের পরিকল্পনা এ সফরে আলোচনা হবে। বিদ্যমান ‘কৌশলগত সহযোগিতা’র প্রেক্ষাপটে আসন্ন সফরটি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী করার একটি সময়োপযোগী সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষত চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর হওয়ায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সফরে ইপিএ চুক্তি কার্যকর বাস্তবায়ন, বাংলাদেশি পণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা জোরদারের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সরকার গত মঙ্গলবার ঢাকা সময় দুপুর ১টা এবং টোকিও সময় বিকাল ৪টায় একই সঙ্গে এই সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী, উপদেষ্টা-অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১, প্রতিমন্ত্রী-বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, উপদেষ্টা-ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, চেয়ারম্যান-ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ (এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান বিষয়ক) সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মিডিয়া টিম এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের মাধ্যমে উল্লিখিত প্রতিনিধি দল গমনাগমন করবেন।
টোকিওতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, জাপানে বাংলাদেশের রফতানি ২০২৪ সালের ১.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১.২৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া মেগা-প্রকল্পগুলোতে জাপানি সহযোগিতা বিনিয়োগ পরিবেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। জাপান শ্রমবাজারের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ঢাকায় ‘জাপান সেল’ গঠন করেছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে টয়োটা টুশো করপোরেশনের একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে ঢাকায় বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাপানের সোরামিতসু কোম্পানি লিমিটেডের একটি প্রতিনিধি দল দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীল অগ্রগতির প্রশংসা করেন। সোরামিতসু একটি আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন প্রতিষ্ঠান। যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে যোগাযোগ ও সামঞ্জস্য বজায় রেখে সিবিডিসি বা সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি নিয়ে কাজ করছে।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনায় ঢাকা সবার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে পথ চলতে চায়, জাপান সফরে বিশ্বের কাছে এই বার্তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হবে। জাপানের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ঢাকা টোকিওর সঙ্গে আসন্ন সফরে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে গুরুত্ব দেবে।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য জাপানের সঙ্গে এই ইপিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন সফরে এই চুক্তির আলোকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। গত তিন ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত ২১ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উত্থাপিত এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসমর্থন করা হয়।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই এই চুক্তি বাস্তবায়নের মূল পথ উন্মুক্ত হয়েছে। আসন্ন সফরে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র (১২০০ মেগাওয়াট), যমুনা রেলওয়ে ব্রিজ বাস্তবায়নসহ বাংলাদেশের একাধিক মেগা প্রকল্পের সঙ্গে জাপান জড়িত। এসব প্রকল্প নিয়েও আসন্ন সফরে দুপক্ষের মধ্যে আলাপ হবে।
বাংলাদেশ জাপানে মূলত তৈরি পোশাক, গৃহস্থালির টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা এবং সামুদ্রিক খাবার রফতানি করে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মূলত লোহা ও ইস্পাত, যানবাহন, খনিজ জ্বালানি, তেল, পাতন পণ্য, যন্ত্রপাতি, পারমাণবিক চুল্লি, বয়লার, কৃত্রিমভাবে তৈরি স্ট্যাপল ফাইবার, অপটিক্যাল, ফটো, কারিগরি, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, কৃত্রিমভাবে তৈরি ফিলামেন্ট, ইমপ্রেগনেটেড, লেপযুক্ত বা স্তরিত টেক্সটাইল কাপড়, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম এবং প্লাস্টিক জাপান থেকে আমদানি করে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে