ছবি : সংগৃহীতহযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হচ্ছে না। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব, রাজস্ব ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা ও ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা— এই চার শর্তে মতবিরোধে আটকে আছে চুক্তি।
এতে নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচালনার ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা না রাখায় দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এখন চুক্তি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি দেশের আর্থিক ও আইনি স্বার্থ সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে এ জটিলতা কাটতে পারে। তবে চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে সমঝোতা না হলে নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
মন্ত্রণালয় ও বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন, আয় ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা এবং ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। গত দুই বছরে এ বিষয়ে ২০টির বেশি বৈঠক হয়েছে। তারপরও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আলোচনা অনেক দূর এগোলেও চারটি শর্তে ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না বেবিচক ও জাপানি কনসোর্টিয়াম। টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে জাপানি পক্ষ কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। তবে সেগুলোতে সম্মতি দেয়নি বেবিচক। ফলে চুক্তির বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
বেবিচক সূত্র জানায়, অমীমাংসিত বিষয়গুলো লিখিতভাবে বিমান মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর চুক্তি চূড়ান্ত করা হতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে টার্মিনাল চালুর নির্ধারিত সময় নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখা দরকার ছিল। একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় এখন দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে চুক্তির শর্ত নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সমঝোতা করতে বেবিচককে বেগ পেতে হচ্ছে।
চার শর্তে আটকে চুক্তি
প্রথম শর্ত— গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব ও ঝুঁকি : জাপানি কনসোর্টিয়ামের একটি শর্ত হলো, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সব দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করতে হবে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বলতে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের যাত্রী ও মালামাল ওঠানো-নামানো, লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবাকে বোঝায়।
অর্থাৎ থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ ও এ-সংক্রান্ত ঝুঁকি বহন করতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাকে। এ কাজ থেকে বিমান কীভাবে আয় করবে এবং আয়ের অংশ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় শর্ত— রাজস্ব ভাগাভাগি : টার্মিনাল পরিচালনা থেকে পাওয়া আয়ের কত অংশ বাংলাদেশ পাবে তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি পক্ষকে বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অপারেশনাল প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আট মাসের জন্য জাপানি কনসোর্টিয়াম ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
অর্থাৎ এ সময়ে বাংলাদেশকে আগের নির্ধারিত হারের অর্ধেক রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সরকারের সম্ভাব্য আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজস্বের এই হার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তি চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না।
তৃতীয় শর্ত— আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তি : দেশের প্রচলিত আইন এবং ভবিষ্যতে আইনে পরিবর্তন এলে তা কার্যকর করার বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাপানি পক্ষ তাদের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তি চেয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান হলো, সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন করলে কিংবা বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করলে তা জাপানি কনসোর্টিয়ামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ দেশের আইন ও সাধারণ আইনি পরিবর্তনের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতে রাজি নয় বাংলাদেশ।
জাপানি পক্ষের অবস্থান হলো, দেশের সাধারণ আইনে পরিবর্তন এলে তা তাদের ওপর প্রয়োগ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুরক্ষা, দায়মুক্তি বা ছাড় দিতে হবে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধ চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চতুর্থ শর্ত— ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা : থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজে কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের দায় কতদিন পর্যন্ত থাকবে, তা নিয়েও দুই পক্ষ একমত হতে পারেনি। এ সময়সীমাকে ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) বলা হয়।
বাংলাদেশ এ সময়সীমা ৯ মাস রাখার পক্ষে। তবে জাপানি পক্ষ তা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবি জানিয়েছে। অর্থাৎ ত্রুটি সংশোধনের দায় কতদিন পর্যন্ত থাকবে তা নিয়ে তিন মাসের ব্যবধান রয়েছে। এ বিষয়েও সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া আটকে আছে।
এ ছাড়া টার্মিনাল চালুর প্রথম দিন কতটি নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বেবিচক প্রথম দিন অন্তত ১০টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে চায়। অন্যদিকে জাপানি পক্ষের প্রস্তাব চারটি ফ্লাইট। ফলে উদ্বোধনের দিন থেকেই টার্মিনালের কার্যক্রম কীভাবে শুরু হবে তা নিয়েও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চারটি শর্তের বিষয় শুধু টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম, প্রকল্পের ত্রুটির দায় এবং দেশের প্রচলিত আইন কার্যকরের বিষয় জড়িত। তাই দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার পাশাপাশি দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
এখন এসব শর্তে কী ধরনের পরিবর্তন বা সমন্বয় করা হবে, তা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত না দিলে চুক্তি চূড়ান্ত করতে আরও সময় লাগতে পারে। এতে ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
বিকল্প ব্যবস্থা না রাখায় দরকষাকষিতে দুর্বলতা : বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এম মফিদুর রহমান বলেন, শর্তগুলো খুবই স্পর্শকাতর। দেশের স্বার্থ ও আর্থিক বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। এখন জাপানি পক্ষের শর্ত মেনে নেওয়া হলে ভবিষ্যতেও তারা নতুন দাবি তুলতে পারে। তাই দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের উচিত চুক্তির প্রতিটি শর্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একটি মাত্র অপারেটরকে বেছে নেওয়ায় দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এখন চুক্তির শর্ত নিয়ে সমঝোতা করতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান সময়ের আলোকে বলেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে। তবে নতুন চারটি শর্ত এসেছে, যা বেবিচকের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বিষয়টি জানিয়ে বিমান মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার সবুজ সংকেত দিলে চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। তবে তার দাবি, নতুন শর্তগুলো চুক্তিতে তেমন প্রভাব ফেলবে না। দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, সরকারের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন। তবে চারটি শর্তের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ওপরই এখন পুরো প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নির্ভর করছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে