মেহেরপুরে চায়ের দোকানে হালনাগাদ হচ্ছে শিক্ষকদের সার্ভিস বই। ছবি : সময়ের আলোমেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই অফিসের বাইরে চায়ের দোকানে বসে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সার্ভিস বই হালনাগাদ করার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর)-এর পার্ট-১-এর পরিশিষ্ট-৮ অনুযায়ী, নন-গেজেটেড কর্মচারীদের সার্ভিস বই সংশ্লিষ্ট দফতরের অফিস প্রধান সংরক্ষণ করবেন। নিয়মানুযায়ী, সার্ভিস বই হালনাগাদ করার কাজটি সংশ্লিষ্ট দফতরের অফিসে বা কর্মরত প্রতিষ্ঠান প্রধানের কক্ষেই সম্পন্ন হওয়ার কথা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষকের অনুপস্থিতিতেই চায়ের দোকান ও বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে বসে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকরা সার্ভিস বই লিখছেন। এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, প্রধান শিক্ষকদের কাছে বই দেওয়া হয়েছে; তারা চায়ের দোকানে কাজ করবেন নাকি মঙ্গলগ্রহে বসে করবেন, সেটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়।
বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সার্ভিস বুক হলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দাফতরিক নথি। এতে একজন শিক্ষকের চাকরি জীবনের শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত সমস্ত পেশাগত তথ্য ও ইতিহাস আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ থাকে। এর মধ্যে রয়েছে— যোগদান ও প্রথম নিয়োগের আদেশ নম্বর, জাতীয় পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ (পে-ফিক্সেশন), টাইমস্কেল, পদোন্নতি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বদলি ও যোগদানের তারিখ, অর্জিত ও চিকিৎসা ছুটিসহ বিভিন্ন ছুটির হিসাব, পেশাগত প্রশিক্ষণ, পুরস্কার এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিবরণ।
সার্ভিস বুকে কোনো ধরনের ঘষামাজা বা অস্পষ্টতা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও গোপনীয় নথি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অফিস প্রধান ছাড়া অন্য কারো এটি দেখার বা জানার সুযোগ নেই। উন্মুক্ত স্থানে সবার সামনে এই বই চলে আসায় কর্মস্থল ও সহকর্মীদের মাঝে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মূল সার্ভিস বুক সাধারণত নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অফিসে সংরক্ষিত থাকে এবং শিক্ষক বদলি হলে তা নতুন কর্মস্থলে পাঠানো হয়। এটি উপজেলা শিক্ষা অফিস বা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের হেফাজতে নিরাপদ রাখতে হয়। শিক্ষক নিজে বা তার মনোনীত প্রতিনিধি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এটি দেখতে পারেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সার্ভিস বুক হালনাগাদ করার মূল দায়িত্ব প্রধান শিক্ষক ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত।
কিন্তু কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করেই উপজেলা শিক্ষা অফিসার সার্ভিস বইগুলো বাইরে দিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
উপজেলা শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি আকতারুজ্জামান বকুল বলেন, সব শিক্ষককে উপস্থিত করা সম্ভব নয়, তাই আমরা বইগুলো দেখে আজকেই জমা দেব— এই লক্ষ্যেই এখানে আসা।
তবে, সার্ভিস বই এভাবে জনসমক্ষে দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি গোলাম ফারুক বলেন, এটি একটি গোপনীয় সরকারি সংরক্ষিত নথি। এই রেকর্ডে চাকরিজীবনের ভালো-মন্দ সমস্ত তথ্য থাকে। এটি অফিসের মধ্যেই সংরক্ষিত থাকার কথা। ইতোমধ্যে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে তিনটি বই হারিয়ে গেছে, যা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবদুর রশীদ জানান, যাদের সার্ভিস বুক, তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে— মানে হেডমাস্টারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আপডেট করে জমা দেবেন। হেডমাস্টার তার দায়িত্ব পালন করছেন। এক হাজার লোক ডেকে তো সার্ভিস বুক দেওয়া সম্ভব নয়।
উন্মুক্ত স্থানে সার্ভিস বই দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যার যার বই সে চায়ের দোকানে করবে না মঙ্গলগ্রহ থেকে করবে, সেটা তার বিষয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার সুকুমার মিত্র বলেন, আপনারা উপজেলা শিক্ষা অফিসে যান। জেলায় বসে তো এত মনিটরিং করা যায় না। এ বিষয়ে আপনি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে কথা বলুন। এটি তার জুরিসডিকশন (এলাকা), তিনি যা করার সেটাই করবেন।
সময়ের আলো/আতা