ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সংগৃহীত ছবি গত কয়েক বছরের মতো এবারও ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের কেন্দ্রে রয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নানা দিক থেকে এবারের নির্বাচনে তাকে দুর্বল মনে হলেও ভোটারদের মধ্যে তাঁর ডানপন্থি রাজনীতির প্রভাব এখনো শক্তিশালী। অনেকের ধারণা, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা এবং গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানই হবে এবারের নির্বাচনের প্রধান ইস্যু। এক অর্থে তা-ই। তবে এসব বিষয় ভোটারদের কাছে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নির্ভর করছে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘটনাগুলোর সম্পর্ক, তাঁর ভূমিকা এবং হামাসের হামলার বিষয়ে তিনি আগে থেকে কতটা জানতেন, তার ওপর।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের ভোটের আগে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে ভোটাররা ইতিমধ্যে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। নেতানিয়াহু কিংবা তার জোটের শরিকদের যারা ভোট দেবেন, তাঁরা ৭ অক্টোবরের ঘটনা এবং এরপর ইসরাইলের নেওয়া পদক্ষেপ সত্ত্বেও, এমনকি বলা যায় এসব ঘটনার কারণেই তাঁদের সমর্থন করছেন। ফলে নির্বাচনটি আশ্চর্যজনকভাবে অনেকটাই নিরুত্তাপ হয়ে পড়েছে।
খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, নেতানিয়াহুর বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বিরোধিতা করে লাখ লাখ ইসরাইলি রাস্তায় নেমেছিলেন। গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আটক ইসরাইলি জিম্মিদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা উপেক্ষা করে তিনি যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব কারণে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল, এবারের নির্বাচনে উত্তেজনা বাড়বে এবং নেতানিয়াহু ও ডানপন্থিরা ক্ষমতা হারানোর মুখে পড়বেন। কিন্তু বাস্তবে রাস্তায় বড় ধরনের বিক্ষোভ বা ব্যাপক গণজমায়েত দেখা যাচ্ছে না।
উভয় পক্ষেই ডানপন্থিদের প্রভাব
ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহু দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন। তার লিকুদ পার্টি বর্তমান আসনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১০ থেকে ১৫টি আসন হারাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নেতানিয়াহুর অবস্থান দুর্বল হলেও ইসরাইলি ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থি মনোভাব এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী।
অন্তত তিনটি উগ্র ডানপন্থি দলের নির্বাচনি কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার বিষয়টি রয়েছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে এই দলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ২০টি আসন পেতে পারে, যা পার্লামেন্টের মোট আসনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কোনো ঐক্যবদ্ধ জোট নেই। মূলত দুটি বিষয়ে তাদের ঐকমত্য রয়েছে—নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে এবং অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে।
বিরোধী দলগুলোর কয়েকটিকেও ডানপন্থি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। টুগেদার পার্টির প্রধান নাফতালি বেনেট এবং ইসরাইল ইজ আওয়ার হোম পার্টির নেতা আভিগদর লিবারম্যান—দুজনই নেতানিয়াহু সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকট এখন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁকে ইসরাইলের মধ্য-বামপন্থি রাজনীতির আশার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে আইজেনকটও বিদ্যমান বসতিগুলোর সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর নির্বাচনি তালিকায় রয়েছেন বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক বসতি স্থাপনকারী এবং ডানপন্থি রাজনীতিক। তাঁদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁরা নেতানিয়াহুর বিতর্কিত বিচার বিভাগীয় সংস্কারকে সমর্থন করেছিলেন।
এর আগে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন আইজেনকট। কিন্তু তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সমালোচনার মুখে এখন তিনি সেই সম্ভাবনা কার্যত নাকচ করে দিচ্ছেন।
আইজেনকটের কাছ থেকে আসলে কী প্রত্যাশা করা যায়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ জনমতের কাছে তিনি নিজেকে বেশ ডানপন্থি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তাঁকে তুলনামূলক উদারপন্থি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, বেনেট ও লিবারম্যান বামপন্থি এবং মধ্যপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করলেও তাঁদের প্রকাশ্য বর্ণবাদী অবস্থান, ইসরাইলি বসতি স্থাপনের প্রতি সমর্থন এবং কঠোর নিরাপত্তানীতির বিষয়গুলো আড়াল করা কঠিন।
বসতি স্থাপনকারীদের বিদ্রোহের আশঙ্কা
ইসরাইল কোন দিকে এগোচ্ছে এবং গাজা, লেবানন, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও ইরানের ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব বিষয়ে নির্বাচনি আলোচনায় তেমন গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে না।
গাজায় রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা কিংবা গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে বিরোধী দলগুলো খুব একটা কথা বলছে না। পশ্চিম তীর কীভাবে পরিচালিত হবে, সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস হামলা কীভাবে বন্ধ করা হবে কিংবা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে—এসব বিষয়েও তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান নেই।
বাস্তবে আইজেনকট নির্বাচনে জয়ী হলে সহিংস বসতি স্থাপনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সেনাবাহিনীর সাবেক এই প্রধান বসতিগুলোকে আবার সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেওয়া সংস্কারগুলো বাতিল করতে চান। এসব সংস্কার কার্যত পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে একীভূত করার একটি পদ্ধতি হিসেবে কাজ করেছে।
অনেকের ধারণা, আইজেনকট এখনো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। বসতি স্থাপনকারীরা তাঁকে বোঝানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন যে পশ্চিম তীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর কার্যকর ক্ষমতা সীমিত।
এমনকি ইসরাইলের রক্ষণশীল ভাষ্যকাররাও বলছেন, পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আইজেনকট নির্বাচনে জয়ী হলে তাঁকে একধরনের বসতি স্থাপনকারী বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হতে পারে। গত কয়েক মাসে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের যেসব হামলা হয়েছে, নতুন সরকারকে দুর্বল করতে তারা আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে কয়েক হাজার সশস্ত্র মিলিশিয়া সদস্য রয়েছে। সেনাবাহিনীর ভেতরেও তাঁদের শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর আনুগত্য কোন দিকে থাকবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পশ্চিম তীরে ডানপন্থি বসতি স্থাপনকারীদের চাপ থেকে মুক্তি পেতে আইজেনকটের জন্য একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠন। তবে বাস্তবে এমন সমঝোতা করা কঠিন হবে। আইজেনকটের ভোটার ও মিত্ররা সবচেয়ে কম যে বিষয়টি দেখতে চান, তা হলো নেতানিয়াহুর আবারও সরকারে ফিরে আসা এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা।
২০২০ সালে সাবেক আরেক সেনাপ্রধান বেনি গান্তজের সঙ্গে নেতানিয়াহু এ ধরনের ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতা ভয়াবহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।
অন্যদিকে, সরকারে নিজের প্রাধান্য থাকবে না— এমন কোনো চুক্তি নেতানিয়াহু মেনে নেবেন, সেই সম্ভাবনাও খুব কম। তবে এ ধরনের সমঝোতা হলে উগ্র ডানপন্থিদের প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে বসতি স্থাপনকারীদের বিদ্রোহের আশঙ্কা এড়ানোর পাশাপাশি উগ্রপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গিভির ও স্মোট্রিচকে সরকার থেকে দূরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সবকিছু নির্ভর করছে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেন, তার ওপর। বর্তমানে জনমত জরিপগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর জোটের আসনসংখ্যা ৫১টি দেখানো হচ্ছে।
নেতানিয়াহু যদি এই সংখ্যা ৬১-এর কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর অনেক ডানপন্থি সংসদ সদস্যকে নিজের দিকে টেনে এনে আবারও ক্ষমতায় থাকার বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ