গ্রাফিক : সময়ের আলো ‘ডাটা আছে গতি নেই’, ‘সার্ভিস আছে কোয়ালিটি নেই’ বছরের পর বছর এভাবে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের মোবাইল খাত। ফলে হাজারো অভিযোগ নিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দ্বারস্থ হন মোবাইল গ্রাহকরা। শুধু চলতি অর্থবছরেই মোবাইল সেবার মান নিয়ে বিটিআরসিতে অভিযোগ জানিয়েছেন সাড়ে এগারো হাজার ভুক্তভোগী। ২৩টি ক্যাটাগরিতে করা এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নিয়ে। যদিও এসব অভিযোগের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ অভিযোগই ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট অপারেটররা।
বিটিআরসির সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অপারেটরদের বিরুদ্ধে মোট ২৩টি ক্যাটাগরিতে ১১ হাজার ৬৬৭টি অভিযোগ করেছে মোবাইল গ্রাহকরা। এর মধ্যে ডাটা স্পিড নিয়ে ৭৩৬টি, ডাটা ভলিউম নিয়ে ৩০৪টি, ডিসকানেক্টেড কল নিয়ে ৩৩৪টি, প্রতারণামূলক কার্যক্রম ১৮৩টি, ইনকামিং ও আউটগোয়িং কল ও এসএমএস সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ৫৩৯টি, লাইসেন্স ইস্যু নিয়ে ৬৪টি, এমএফএস ব্যাংকিং নিয়ে ৫৯টি, বিবিধ ১৩৪৩টি, এমএনপি নিয়ে ৪৯২ট, প্যাকেজ মাইগ্রেশন নিয়ে ৩৬১টি, কোয়লিটি অব সার্ভিস নিয়ে ৪১৬২টি, কুইজ প্রাইজ অ্যাওয়ার্ড ইস্যু নিয়ে ৭১টি, রিচার্জ বিলিং নিয়ে ৪৭৬টি, সিমবার নিয়ে ২১৪টি, সিম মালিকানা নিয়ে ১৭৪টি, সিম নিবন্ধন নিয়ে ২৫৪টি, সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাইবার নিয়ে অভিযোগ ৬৮টি, ট্যারিফ সংক্রান্ত ৩০৪টি, টেস্ট কল নিয়ে ১০২টি, অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেট বা এনইআইআর নিয়ে ৩৬৬টি, অবৈধ আইএসপি নিয়ে ৪১টি, আনাকাঙ্ক্ষিত কল ও এসএমএস সংক্রান্ত ৯২টি ও মূল্য সংযোজন সেবা (ভ্যাস) নিয়ে ৯২৮টি অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। এসব অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ৩৬২টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে বিটিআরসি। এ ছাড়া ৩০৫টি অভিযোগ অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪২৭টি। যার মধ্যে ১০ হাজার ৩১১টি অভিযোগ নিষ্পত্তির দাবি করেছিল বিটিআরসি। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ২২৫টি ও নিষ্পত্তি করা হয়েছিল ৮৯২০টি। তবে প্রতিবারই অভিযোগের পাহাড় ছিল কোয়ালিটি অব সার্ভিস নিয়ে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে এ বিষয়ে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম সময়ের আলোকে বলেন, রবির বিষয়ে বিটিআরসিতে উত্থাপিত বিষয়গুলোর ৪০ শতাংশের বেশি অনুসন্ধানমূলক বা ইনকোয়ারি। বিটিআরসি থেকে আমরা যেসব অভিযোগ ও বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান পেয়েছি, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিটিআরসি থেকে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশ ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে।
গ্রাহকসেবার মানোন্নয়ন এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিকে রবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিটিআরসির কোয়ালিটি অব সার্ভিস নির্দেশনাতে উল্লেখিত মানদণ্ডগুলো রবি বজায় রেখে আসছে। পাশাপাশি সেবার মান, ডেটা স্পিড ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে নিয়মিতভাবে নেটওয়ার্ক ও সেবা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গ্রাহকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, বিদ্যমান বহুস্তরীয় লাইসেন্সিং কাঠামো, অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের অনুপস্থিতি, অপারেটর কর্তৃক সীমিত তরঙ্গে অধিক সংখ্যক গ্রাহককে সেবা প্রদান এবং টেলিযোগাযোগবান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতিসহ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিতের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। গ্রাহক স্বার্থ সুরক্ষায় স্পেকট্রাম নিলাম ও পুনর্বিন্যাস, কোয়ালিটি অব সার্ভিস মনিটরিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত এবং সেবার মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে বিটিআরসি।
এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির সময়ের আলোকে বলেন, গত পাঁচ থেকে দশ বছরে দেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে কিন্তু সেই তুলনায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর উন্নয়ন কম হয়েছে। অপারেটররা গ্রাহক অনুপাতে তাদের সাইট বাড়ায়। কিন্তু স্প্রেকটার্ম বাড়ায়নি। এমনকি দেশের সব স্থানে তারা ফোরজি সার্ভিসও ডেভেলব করেনি। অবকাঠামতে প্রপার ইনভেস্টমেন্ট হয়নি।
তাই গ্রাহকসেবার মান বাড়ছে না। তিনি আরও বলেন, কোয়ালিটি সার্ভিস হচ্ছে বিশাল পরিসরে। এর মধ্যে কলড্রপ, ডাটা স্পিড, নেটওয়ার্ক সমস্যাসহ অনেক কিছুই আছে। তাই গ্রাহকের অভিযোগ অনুযায়ী কোয়ালিটি সার্ভিস বলতে কি কলড্রপ হচ্ছে, কোয়ালিটি সার্ভিস মানে কি ইন্টারনেট স্পিড কম পাচ্ছে নাকি সব জায়গায় কভারেজ পাচ্ছে না? এসবগুলোই কিন্তু কোয়ালিটি সার্ভিস। এসব অভিযোগগুলোকে ক্লাসিফাই করা দরকার যে, অভিযোগের কারণটা কি।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, সংশোধিত টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১০ অনুযায়ী কোনো গ্রাহক অভিযোগ করলে তা সাত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এতে যদি কোনো অপারেটর ব্যর্থ হয় তা হলে বিটিআরসি ওই অপারেটরের বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকা জরিমানা করতে পারে অথবা লাইসেন্স বাতিল করতে পারে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনের এমন প্রয়োগ দেখা যায়নি। গ্রাহকরা অভিযোগ করলেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তা আলোর মুখ দেখে না। তা ছাড়া সব গ্রাহক তো অভিযোগ করতেও পারে না। কোথায় করবে তাও জানে না। আমাদের কাছেও অনেকে অভিযোগ করে।
তিনি আরও বলেন, অপারেটরদের বিরুদ্ধে কিংবা সেবার মান নিয়ে যদি সবাই অভিযোগ করতে পারত তা হলে এই অভিযোগ লক্ষাধিক ছাড়া তো। গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিটিআরসি ব্যর্থ।
চলতি বছরের আগস্ট (২০২৬ সাল) মাস পর্যন্ত দেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৯ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক রয়েছে ৮ কোটি ৭২ লাখ, রবি আজিয়াটার গ্রাহক হচ্ছে ৫ কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার, বাংলালিংকের গ্রাহক রয়েছে ৩ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ও রাষ্ট্রীয় অপারেটর টেলিটকের গ্রাহক হচ্ছে ৬৯ লাখ। এসব গ্রাহকদের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১ কোটি ৫৪ লাখ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে