গ্রাফিক : সময়ের আলো নূরুল কবীর। বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নে তার অবস্থানের কারণে তিনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে পরিচিত নাম। তিনি ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের সম্পাদক। ২০২৫ সালের নভেম্বরে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন।
সম্প্রতি সময়ের আলোর জন্য তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংস্কৃতিকর্মী শায়রুল কবির খান। দুজনের দীর্ঘ আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের রাজনীতিতে রিকনসিলেয়েশন, বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের পলিটিক্সের চরিত্রগত নানা দিক। আলাপে সংকটের পাশাপাশি আছে সমাধানেরও বয়ান।
সময়ের আলো : আমাদের সমাজে সংঘাতশীল রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ভেতর ‘রিকনসিলেয়েশন’ প্রক্রিয়ার কথা উঠেছে। আপনি নিজেও এ বিষয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে’ কথা বলেছেন। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সংঘাতে বিভিন্ন পক্ষ জড়িয়ে পড়েছে, ফলে আমাদের সমাজ নানা বিপজ্জনক মাত্রায় বিভক্ত হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা কতটুকু?
নূরুল কবীর : পৃথিবীর নানা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সংঘাত, পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ভাবাদর্শিক শিবিরের সংঘর্ষ, ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্যগত ঘাত-প্রতিঘাত প্রভৃতি নিরসনের জন্য এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে প্রায় ৫০টি রিকনসিলেয়েশন/ট্রুথ/হিলিং কমিশন বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি বিভিন্ন মাত্রায় সফল হয়েছে, কোনো কোনোটি ব্যর্থ হয়েছে, আবার কোনো কোনো জায়গায় সংঘাত নিরসনের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
এই কমিশনগুলো গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় স্বভাবতই নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ‘সাধারণ’ ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামোগত রূপরেখা গড়ে উঠেছে; আর সেই রূপরেখা অনুযায়ী সংঘাতশীল পক্ষগুলোর ভেতর যথার্থ রিকনসিলেয়েশনের জন্য এমনকি প্রক্রিয়াটি শুরুর জন্য কয়েকটি ন্যূনতম পূর্বশর্ত প্রয়োজন হয়।
প্রথমত, রিকনসিলেয়েশনের জন্য সংঘাতশীল পক্ষগুলোর নিঃশর্ত সম্মতি। দ্বিতীয়ত, সংঘাতের কারণ ও দায় নির্ণয়ের জন্য সংঘাতশীল পক্ষগুলোর যৌথ অনুসন্ধান, যৌথভাবে তদন্ত সম্পাদন এবং যৌথভাবে নির্ণীত/চিহ্নিত অপরাধের পারস্পরিক দায় স্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনা ও দায়ী ব্যক্তিদের আইনানুগ বিচারের আওতায় আনয়নে ঐকমত্য। তৃতীয়ত, সংঘর্ষের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দানের ব্যবস্থা করা এবং চতুর্থত, রিকনসিলেয়েশনের জন্য যৌথভাবে প্রণীত একটি রূপরেখা ধরে অগ্রসর হওয়া।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানের পর থেকে বিগত ৫৫ বছর ধরে আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে যেসব তিক্ত ও ক্ষতিকর সংঘাতমূলক পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে, তা নিরসন করা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতির জন্য নিশ্চয় জরুরি। কিন্তু বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ভেতর সংঘাত নিরসনের আন্তরিকতা এখনও দৃশ্যমান নয়, একে অন্যকে পরাজিত করে প্রতিপক্ষের ওপর আপন আধিপত্য নিশ্চিত করার ব্যাপারেই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আগ্রহ বিদ্যমান রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এ মুহূর্তে কটি সংঘাতশীল পক্ষ বিদ্যমান রয়েছে, যাদের ভেতর রিকনসিলেয়েশনের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন?
এ দেশের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবিকাশমান অসহনীয় আয়-বৈষম্যজাত বিস্ফোরোন্মুখ সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি ছাড়াও রাজনৈতিক পরিসরে স্বাধীনতাযুদ্ধে গণহত্যাকারী পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয় সহযোগী জামায়াতে ইসলামী ও তার দোসরদের সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শক্তিগুলোর অনিষ্পত্তিকৃত সংঘর্ষমূলক তিক্ত সম্পর্ক আর সমতলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে অবাঙালি পার্বত্য জনগোষ্ঠীর সাংঘর্ষিক সম্পর্ক ৫৫ বছর ধরেই বিদ্যমান রয়েছে।
অন্যদিকে এই দুটি পুরোনো প্রপঞ্চের সঙ্গে, আওয়ামী লীগের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণতন্ত্রপরায়ণ গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগ্রামী জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের মাধ্যমে এক সহস্রাধিক প্রতিবাদী মানুষকে হত্যা ও ২০ সহস্রাধিক মানুষকে গুরুতরভাবে আহত করে লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি ও লীগ নেতৃত্বের দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভেতর সৃষ্ট রাজনৈতিক সংঘাতমূলক পরিস্থিতিটি নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভেতর গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির আলোকে জাতীয় সংহতি গড়ে তুলে, সমকালীন প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে আত্মমর্যাদা ও জাতীয় সংহতির ভিত্তিতে স্থিতিশীল সামষ্টিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভেতর রিকনসিলেয়েশন প্রয়োজন রয়েছে। শিগগিরই এই রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়া শুরুর কোনো উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না।
জাতীয়তাবাদী দল, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও জামায়াত ইসলামীসহ গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী অপরাপর সংগঠনও ‘ট্রুথ ও রিকনসিলেয়েশন কমিশন’ গঠন করে, নির্বাচনের পর, লীগ আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক ঘটনাগুলোর সত্য উদঘাটন, অপরাধীদের শাস্তি বিধান ও সামাজিক-রাজনৈতিক রিকনশিলেয়েশনের কথা বলেছিল। দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সাত মাস অতিক্রান্ত হলেও এমন কোনো উজ্জ্বল প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
নির্বাচিত সরকার ও সংসদীয় বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগের এখনও কোনো লক্ষণ যে নেই, তা তো সবার কাছেই স্পষ্ট। তবে সরকারকে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার জন্য লীগ নেতৃত্বের দিক থেকে যা করার প্রয়োজন লীগ তার ঠিক উল্টোটাই করে চলেছে।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ কর্তৃক স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য একতরফা সংবিধান রচনা, লীগের একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, লীগের প্রতি রাজনৈতিকদের অনুগত রক্ষীবাহিনী তৈরি করে ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দমন-পীড়ন, হত্যা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের দলীয়করণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাহরণ ও স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসের দলীয়করণ ইত্যাদির মতো অন্যায় ও অপরাধের কথা বাদ দিলেও বিশেষত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরের সময়কালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন লীগ শাসনামলে সংঘটিত কয়েক হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুম-খুন, জনগণের ভোটাধিকার হরণ, প্রায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ, অসহনীয় আর্থিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার ছাড়াও ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণতন্ত্রপরায়ণ গণঅভ্যুত্থানকালে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে নির্বিচার গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সহস্রাধিক প্রতিবাদী নারী-পুরুষকে হত্যা, ২০ সহস্রাধিককে গুরুতর আহতকরণসহ নানা অপরাধের জন্য লীগ নেতাদের ক্ষমা চাওয়া তো দূরের কথা, তাদের কাউকেই এখন পর্যন্ত এমনকি ন্যূনতম অনুতাপ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি।
উল্টো দেশের বাইরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের নিরাপদ অবস্থান থেকে লীগ নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ গণতন্ত্রকামী লাখো নারী-পুরুষের প্রকাশ্য অংশগ্রহণে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে নিছক একটি ডানপন্থি জঙ্গি হামলা হিসেবেই শুধু নিরন্তর অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে না, দেশের বাইরে গণঅভ্যুত্থানে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাগে পেলেই তাদের ওপর শারীরিক আক্রমণ করে চলেছে।
তা ছাড়া এসব লীগ নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা অনুকূল পরিস্থিতিতে কোনো এক দিন দেশে ফেরার পর গণঅভ্যুত্থানের নেতাকর্মী, সমর্থকদের বিরুদ্ধে কী ধরনের নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণ করবে তারও ফিরিস্তি দিয়ে চলেছে। স্পষ্টতই লীগের এই নেতা ও বুদ্ধিজীবীরা এখন পর্যন্ত বুঝতে অক্ষম যে, তাদের এই বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গি তাদের দলটির রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের জন্য ‘অনুকূল পরিস্থিতি’ তৈরি হওয়ার সহায়ক হতে পারে না।
গণরোষের মুখে ক্ষমতাচ্যুত কোনো রাজনৈতিক দল যখন তার অন্যায় ও অপরাধমূলক কৃতকর্মের জন্য ন্যূনতম ‘অপরাধরোধ’ প্রকাশেও ব্যর্থ হয়, অনুতাপের লক্ষণও যখন প্রদর্শন করে না, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জিঘাংসাবৃত্তির সদম্ভ ঘোষণা প্রচার করতে থাকে, তাদের সঙ্গে রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যূনতম পূর্বশর্তগুলোও অবজ্ঞা করতে থাকে, তখন ওই দলের দীর্ঘ নির্মমতার শিকার রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ওপর রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেশের গণতন্ত্রপরায়ণ সিভিল সমাজের সামনেও কোনো পথ খোলা থাকে না।
জামায়াতে ইসলামীর পুরোনো অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে এই দলটির সঙ্গে আমাদের সমাজের ‘রিকনসিলেয়েশন’ কি সম্ভব?
দেখুন, আমরা যদি দেশের সংঘাতশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিগুলোর ভেতর ‘রিকনসিলেয়েশনের’ বৃহত্তর জাতীয় প্রয়োজনের কথা সাধারণভাবে স্বীকার করি, তা হলে জামায়াত প্রসঙ্গটিকেও আলোচনার বাইরে রাখার অবকাশ থাকে না। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে রিকনসিলেয়েশনের প্রক্রিয়া শুরুর জন্যও পূর্বোল্লেখিত পূর্বশর্তগুলো পূরণ হওয়া অপরিহার্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত গণহত্যাকে জামায়াত শুধু রাজনৈতিকভাবেই সমর্থন করেনি, এই দলটির তৎকালীন নেতাকর্মীরা স্বাধীনতাকামী জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যা পরিচালনায় সশস্ত্র সমর্থন জুগিয়েছে- বিপুল উল্লাসে মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাপন্থি অসংখ্য মানুষের রক্তে নিজেদের হাত রঞ্জিত করেছে।
শুধু তাই নয়, পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরও, পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিশ্চিত উত্থানের পরও, যে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য বিশেষত পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোকে প্রভাবিত করার মরিয়া প্রয়াস গ্রহণ করেছিল, সেই দলটির সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস-সচেতন নাগরিকদের দিক থেকে রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়া শুরু করার যেকোনো রাজনৈতিক প্রকল্প সমর্থন করা দুরূহ বৈকি।
সর্বোপরি সেই প্রক্রিয়া শুরুর জন্য জামায়াতের দিক থেকে ন্যূনতম পূর্বশর্ত পালনের অর্থাৎ তার অপরাধের স্বীকারোক্তি ও আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করার, কোনো রাজনৈতিক লক্ষণ এখনও দৃশ্যমান নয়। উল্টো জামায়াতের নতুন প্রজন্মের নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশকে বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন সময়ে জামায়াতের জনস্বার্থবিরোধী নৃশংস ভূমিকাকে নানাভাবে ন্যায্যতা দানের প্রয়াস নিতে দেখা যায়। তদুপরি স্বাধীনতাযুদ্ধের সাম্যবাদী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার গভীরতাকে লঘু করার জন্য, জনগণের রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে সাম্প্রতিক জুলাই অভ্যুত্থানের বয়ানের নিচে চাপা দিতে তারা বিপুল উৎসাহ প্রদর্শন করে।
তা ছাড়া স্বাধীনতাযুদ্ধে যারা নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, আর যারা প্রাণপণ লড়াইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন সেই প্রক্রিয়ায় যারা জীবন দান করেছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করার মতো অশ্লীল স্পর্ধা প্রদর্শন করতেও তারা কসুর করে না।
ওদিকে আপনি যদি বাংলাদেশকে সুসংহত ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমাজের সংঘাতশীল শক্তিগুলোর ভেতর রিকনসিলেয়েশনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, সে ক্ষেত্রে জামায়াতকে ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করারই সুযোগ কোথায়? একটি ‘রাজনৈতিক ভাবাদর্শ’ হিসেবে ‘গণতন্ত্র’ প্রত্যয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতায়’ বিশ্বাস করে; কিন্তু জামায়াত ‘জনগণের সার্বভৌমত্বের’ ধারণায় বিশ্বাস করে না, রাষ্ট্রপাটসহ লৌকিক জগতে প্রতিষ্ঠিত সব সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনায় জামায়াত, শরিয়াহ আইনের ভিত্তিতে, অলৌকিক ‘আল্লাহর সার্বভৌমত্ব’ কায়েম করতে চায়।
আবার চিরায়ত গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শ রাষ্ট্রের নাগরিকদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে টেনে আনার ধারণা অনুমোদন করে না, ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরেই সীমিত রেখে, সব ধর্মাবলম্বী নাগরিকের জন্য সব বিষয়ে সমানাধিকার নিশ্চিত করার ধারণায় বিশ্বাস করে; কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তার কল্পিত রাষ্ট্রকে ‘ইসলামভিত্তিক’ ধর্মীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত করতে আগ্রহী, যেখানে অপরাপর ধর্মাবলম্বী নাগরিকগণ বৈষম্যের শিকার হতে বাধ্য। জামায়াতের এই রাজনীতি ও রাষ্ট্রদর্শন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মৌল চেতনা ও তার জন্মকালীন ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অসংগতিপরায়ণ।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংহতির নামে জামায়াতের সঙ্গে দেশের যথার্থ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর একতরফা রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো বরং রাজনৈতিক ভাবাদর্শিক সংগ্রামের মাধ্যমে জামায়াতকে পরাজিত করার পথে অগ্রসর হতে পারে।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিকভাবে দুটি পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক-ভাবাদর্শভিত্তিক সংগঠন। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় হলেও তাদের আপন আপন জনস্বার্থবিরোধী অতীত কর্মকা-ের জন্য অনুতাপ প্রকাশ না করার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
আমার নিতান্তই ধারণা যে, সমকালীন লীগ-নেতৃত্ব হয়তো জামায়াতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে ভুল শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের অপরাধমূলক কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ না করার পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার জন্য পুরোপুরি ঘৃণিত ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পরও এমনকি স্বাধীন দেশে তার রাজনীতি চর্চার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করার পরও, মাত্র পাঁচ দশকের ব্যবধানে, জামায়াতে ইসলামী একটি সুসংঘটিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজের পুনরাবির্ভাবই শুধু নিষ্পন্ন করেনি, বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, অতীত অপকর্মের জন্য স্পষ্ট ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়াই, জনগণের ভোটে, ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট সংসদে ৭৭টি আসন বাগিয়ে নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছে।
ফলে লীগ-নেতৃত্বের পক্ষে এ রকম ধারণা পোষণ করা অসম্ভব নয় যে, স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে এ দেশের জনগণ লীগ কর্তৃক সংঘটিত তুলনামূলকভাবে লঘু অপরাধও ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়াই এক দিন ভুলে গিয়ে দলটিকে রাজনৈতিকভাবে শুধু পুনর্বাসিতই করবে না, ফের রাষ্ট্রক্ষমতায়ও অধিষ্ঠিত করবে।
লীগ যদি এভাবে চিন্তা করে থাকে, তা হলে মারাত্মক ভুল করবে। কেননা স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত নিজে নিজেই পুনঃসংগঠিত হয়নি, হতে পারেনি, বরং জাতীয়তাবাদী দল ও আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় ও সক্রিয় সহযোগিতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী দল, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর আরোপিত সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে, প্রথমে জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরাবির্ভাবের পথ উন্মুক্ত করেছিল।
পরবর্তীকালে আশির দশকে জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বাধীন সামরিক-জান্তাবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ ও জাতীয়তাবাদী দল উভয়েই জামায়াতকে অন্যায় ও অন্যায্যভাবে ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, তাকে যুগপৎ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শরিক হিসেবে গ্রহণ করে, বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে তৎপরতা চালানোর সুযোগ করে দিয়ে, রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক জামায়াতকে ‘সামাজিক ন্যায্যতা’ দান করে।
পরবর্তীকালে নব্বইয়ের দশক থেকে নানা সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত কখনো লীগের, কখনো জাতীয়তাবাদী দলের শরিক হিসেবে রাজনীতির ময়দানে তৎপর থেকে নিজের অস্তিত্বকে ক্রমাগত গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হয়।
পরিশেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট লীগশূন্য রাজনৈতিক পরিবেশে জামায়াত জাতীয় সংসদে ‘প্রধান বিরোধী দল’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। এখন ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী দলের সম্ভাব্য ব্যর্থতার মুখে, পরবর্তী নির্বাচনে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভের মাধ্যমে জামায়াত নিজেই সরকার গঠনের পরিকল্পনা করে চলেছে। আমার ধারণা জামায়াতের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ার নয়।
জামায়াতের চূড়ান্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী, সে আলোচনা ও বিশ্লেষণ আপাতত স্থগিত রেখে বরং বলা যায় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে লীগের পুনরাবির্ভাব বা পুনরুত্থানের জন্য অন্য কোনো রাজনৈতিক দল, বিশেষত প্রায় দেড় দশকজুড়ে যারা লীগের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের শিকার হয়েছে, সহসাই তাকে সাহায্য করার জন্য অন্তত প্রকাশ্যে এগিয়ে আসার কারণ নেই।
তা ছাড়া লীগের মনে রাখা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল হয়েও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কারণে, তার শীর্ষ নেতৃত্বকে নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হওয়ার পরও, ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য লীগকে ১৯ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, কিন্তু তার জন্যও আবার ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে লীগ-নেত্রী শেখ হাসিনাকে পিতার আমলের দুঃশাসনের জন্য একাধিকবার সজল নয়নে জনসমক্ষে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়েছিল।
আমার ধারণা, এবারও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে লীগের বৈধ প্রত্যাবর্তনের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের বিরুদ্ধে নিকট অতীতে পরিচালিত গুম-খুন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-সহ জুলাইয়ের রক্তাক্ত সংঘাতের দায় শিকার, প্রত্যক্ষভাবে দায়ী নেতাকর্মীদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যর্পণ ও সাধারণভাবে ওইসব অপরাধের জন্য দলীয়ভাবে প্রকাশ্য অনুশোচনা প্রকাশের মাধ্যমে দলটিকে প্রস্তাবিত রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়ায় সুযোগ গ্রহণ করার আপাতত কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু অবাঙালি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংখ্যাগুরু বাঙালির বিদ্যমান সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ কী?
অবাঙালি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বাঙালির চলমান সংঘাতের মূল কারণ অবাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি বাঙালির উগ্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি হয়ে যাওয়ার’ প্রকাশ্য আহ্বানের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছিল।
পার্বত্য অঞ্চলের চাকমাসহ অপরাপর অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, বীরোচিত সংগ্রামের জন্য কেউ কেউ ‘বীর বিক্রম’ খেতাব লাভ করেছিলেন, তারা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধানের অধীনে পার্বত্য অঞ্চলের ‘স্বায়ত্তশাসন’ দাবি করেছিলেন।
কিন্তু তাদের সেই দাবিকে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার বদলে তৎকালীন লীগ-সরকার সমতল থেকে দরিদ্র বাঙালিদের পার্বত্য এলাকায় অভিবাসিত করে সে অঞ্চলে অবাঙালিদের সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলার নীতি অবলম্বন করে এবং তার প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়াকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করার কৌশল গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে চাকমা সম্প্রদায়ও নিজেদের আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে।
পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালে লীগ সরকারের পতনের পর, যেসব সামরিক-বেসামরিক সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়, তারাও পার্বত্য সংকট সমাধানের জন্য ওই অঞ্চলে যুগপৎ বাঙালি অভিবাসন ও সামরিক সমাধানের পথ ধরে অগ্রসর হয়।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার অবাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এমনকি দীর্ঘ সংলাপ ও সমঝোতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ও অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সংগঠনের সঙ্গে ‘শান্তিচুক্তি’ সম্পাদনের পরও সামরিক সমাধানের ব্যবস্থা জারি রাখা ও তার প্রতি পাহাড়িদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকার কারণে উভয় পক্ষের ভেতর ‘পারস্পরিক অবিশ্বাস’ বিদ্যমান থাকে, যা এখনও দূরীভূত হয়নি।
তথাপি সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা প্রয়োজন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিগত গণতন্ত্রপরায়ণ শিক্ষার্থী-গণঅভ্যুত্থানে অবাঙালি পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অংশগ্রহণ করেছিল।
এমতাবস্থায় কিছু বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ সংকটে নিজেদের যুক্ত করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমতাবস্থায় সারা দেশের গণতান্ত্রিক সংহতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার স্বার্থে, দেশের বাঙালি ও অবাঙালি জনগোষ্ঠীর সংঘাতশীল পক্ষগুলোর ভেতর, যথার্থ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে একটি কার্যকর ‘রিকনসিলেয়েশন প্রক্রিয়া’ শুরু করা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য কর্তব্য হিসেবে হাজির রয়েছে।
রাষ্ট্র ও রাজনীতির গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাক্সক্ষা নিয়ে ২০২৪ সালে যে শিক্ষার্থী-গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, জাতীয়তাবাদী দলের বর্তমান সরকার কি সেই জন-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে?
রাষ্ট্র ও রাজনীতির গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিটি প্রায় দুই দশক ধরে এ দেশের সামাজিক পরিসরে আলোচিত হয়ে আসছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে প্রণীত জাতীয়তাবাদী দলের ৩১ দফা কর্মসূচিতেও রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতির গণতান্ত্রিক সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীকালে বিশেষত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে সমাজের গভীর থেকে এ দেশের রাষ্ট্র অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভসহ তার প্রশাসন ও দেশের প্রচলিত রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি প্রভৃতির মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের সুস্পষ্ট দাবি উত্থাপিত হয়, যার বেশ কিছু ধারণা অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক সংগঠনের আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদে’ স্থান লাভ করে।
কিন্তু ওই তর্ক-বিতর্কের সময় আমরা লক্ষ্য করেছি, জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিনিধিরা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণ সমাজ ও অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বাম রাজনৈতিক ঘরানার অনেক মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি পাশ কাটিয়ে, অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী নিজেদের দলীয় সংস্কার-কর্মসূচির চৌহদ্দির ভেতরেই পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াকে আটকে রাখার প্রয়াস গ্রহণ করেছে। চলমান সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব পদক্ষেপগুলো কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গৃহীত কয়েকটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপকে অকার্যকর করে দেওয়ার মধ্যে দলটির এই দৃষ্টিভঙ্গি অভিব্যক্ত রয়েছে।
জাতীয়তাবাদী দলের এই রক্ষণশীল আচরণের মধ্য দিয়ে যা প্রমাণিত হয়, তা হলো, দলটির নেতৃত্ব হয় গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে শিক্ষার্থী-জনতার মন ও মননে বিকশিত উন্নততর গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার গভীরতার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে, নতুবা তা উপলব্ধি করেও লড়াকু সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বিকশিত উন্নতর গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করে, নিজেদের দলীয় চিন্তাভাবনার গ-ির ভেতরেই বাংলাদেশকে আটকে রেখে, সরকার পরিচালনা করতে স্বস্তি ও আরাম বোধ করছে। কিন্তু তার এই বর্তমান রাজনৈতিক স্বস্তি ও আরামবোধ বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতির গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অমীয় সম্ভাবনাকেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, তার নিজের শক্তিমান গণতান্ত্রিক বিকাশের পথকেও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলবে।
বর্তমান সরকারের গত আট মাসের কর্মকা-কে খুব সংক্ষেপে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এ কথা সত্য যে, জাতীয়তাবাদী দলের বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে এবং পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধমান পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের জন্য জাতীয় অর্থনীতি সামলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতেও কিছু কিছু ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভুল ও অন্যায়ের প্রতিকারমূলক কিছু পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত প্রশংশিত হচ্ছে।
কিন্তু তার সরকারকে এখন পর্যন্ত কোনো পরিসরেই অতীতের তুলনায় গুণগত পরিবর্তনবাচক কোনো যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। তা ছাড়া অধিকাংশ ব্যাপারে তার সরকারের কর্মদক্ষতার মাত্রা জন-আকাক্সক্ষার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। ওদিকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই অসন্তোষজনক। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা উচ্চ পদে প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন নতুন নিয়োগদানের ক্ষেত্রে স্থূল দলীয়করণ পূর্ববর্তী সরকারের আমলের মতোই অব্যাহত রয়েছে। বড় বড় প্রশাসনিক নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে অপ্রকাশ্য আর্থিক-লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ সরকারের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। প্রায় সর্বত্র দলীয় নেতাকর্মীদের অবৈধ দাপট ও চাঁদাবাজি ছোট-বড় নির্বিশেষে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জীবন আগের মতোই অতীষ্ঠ করে চলেছে। এসব কর্মকা- গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে একেবারেই অসংগতিপরায়ণ।
অন্যদিকে একটি স্থল পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বায়নের বর্তমান জমানায় কোনো দেশের ‘জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে’ কী ধরনের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক কর্মকৌশলের ভিত্তিতে স্বদেশি স্বার্থ সমুন্নত রাখা যায়, সে সম্পর্কে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে রীতিমতো বিপজ্জনক মাত্রায় উপলব্ধিহীনতা বিদ্যমান। একটি সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কোনো যথার্থ ‘জাতীয়তাবাদী’ সরকারকে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে নতজানু আচরণ করার প্রয়োজন পড়ে না।
কিন্তু জনসমর্থনে বলিয়ান বর্তমান সরকার কর্তৃক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থবিরোধী অসম বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদন, মাার্কিন অর্থনীতির স্বার্থে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধে নিজ দেশের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ ও যথাযথ প্রাক-প্রস্তুতি ছাড়াই মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার মূল্যের ২৫টি বোয়িং ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ফ্রান্সের কাছ থেকে আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারে ১০টি এয়ারবাস ক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন, লাভজনক নিউমুরিং সমুদ্রবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক একটি বিদেশি কোম্পানিকে হস্তান্তর ইত্যাদি এ দেশের ‘জাতীয়তাবাদী’ স্বার্থের সঙ্গে একেবারেই সংগতিপরায়ণ নয়।
জাতীয়তাবাদী দলের এসব সরকারি সিদ্ধান্ত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিগত দুই দশকে সংগঠনটির ভেতর বিপজ্জনক মাত্রায় বিরাজনীতিকীকরণ ঘটেছে- বিশাল দলটির কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত বিনস্ত বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের প্রকাশ্য রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আলাপ-আলোচনা ও কর্মকা-ের ভেতর ‘জাতীয়তাবাদী চেতনার’ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি উন্মোচিত হয়ে চলেছে। এমতাবস্থায় সরকারের গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার জন্য গণতন্ত্রপরায়ণ দেশপ্রেমিক জনসমাজের চাপ প্রয়োগ ও জারি রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে