ইসরায়েলের নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। তাদের আশঙ্কা, বাস্তুচ্যুতি ও নানা বিধিনিষেধের মধ্যে কবে নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে পারবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। ছবি : আল জাজিরা
বছরের পর বছর যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। তবে নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও যুদ্ধ, দখলদারত্ব ও দুর্ভোগের অবসান হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকটের পর তাদের অনেকেই আশা করছেন, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি ফিরবে তাদের জীবনে। তবে সেই আশার পাশাপাশি রয়েছে নতুন করে সহিংসতা ও দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কাও।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও গাজায় প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। একই সঙ্গে অবরোধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং বিপর্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন উপত্যকার বাসিন্দারা।
মঙ্গলবার ইসরায়েলে নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য ভোট হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার সরকারের কট্টর ডানপন্থী নেতাদের কেউ কেউ গাজার বাসিন্দাদের বিতাড়িত করার মতো অবস্থানও নিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন উপত্যকার অনেক বাসিন্দা।
নেতৃত্ব বদলালে স্বস্তি ফিরবে, এমন নিশ্চয়তা নেই
উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এলিয়ান এখন দেইর আল-বালাহতে পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি আশা করছেন, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে কে ক্ষমতায় আসবেন, তা জানার জন্য তারা ইসরায়েলের নির্বাচন অনুসরণ করছেন। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির উন্নতি এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন তারা।
এলিয়ান মনে করেন, সাবেক ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডার গাদি আইজেনকট নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে তুলনামূলক ভালো হতে পারেন। তার আশঙ্কা, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও কট্টর ডানপন্থী মিত্ররা আবার ক্ষমতায় এলে গাজায় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
তবে নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেই ইসরায়েলের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, এমন প্রত্যাশা তার নেই।
এলিয়ানের ভাষায়, ইসরায়েল এখনো তাদের শত্রু। তাই পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে নেতানিয়াহুর তুলনায় কম কঠোর কেউ ক্ষমতায় এলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে বলে আশা করেন তিনি।
তার প্রত্যাশা, ইসরায়েলের পরবর্তী নেতা যুদ্ধ বন্ধ করবেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও অনাহার প্রতিরোধ করবেন এবং গাজার সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে বিধিনিষেধ শিথিল করবেন।
পুনর্গঠন নিয়ে গভীর সংশয়
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৪১ বছর বয়সী ইসলাম সালেম তিন মেয়েকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার মতে, ইসরায়েলের নির্বাচন গাজার মানুষের জীবন ও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, রাজনীতি তাদের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ— সবকিছুই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
তবে নতুন সরকার এলেও গাজা নিয়ে ইসরায়েলের নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন না সালেম। তার আশঙ্কা, সরকারে নতুন মুখ এলেও গাজার মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকতে পারে।
গাজার তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে প্রায় ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে উপত্যকার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ অবস্থায় দ্রুত পুনর্গঠন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও সন্দিহান সালেম।
তিনি বলেন, গাজার মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার মতো অবস্থাও আর অবশিষ্ট নেই। প্রতিদিন তাঁরা শুধু বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সামনে কী ঘটবে, তা জানেন না কেউই।
ইসরায়েলের নির্বাচনের ফল তাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন গাজার ফিলিস্তিনি নারী হানান আবু আল-মাআজা। ছবি : আল জাজিরা
১২ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েও নিরাপত্তাহীনতা
৫৭ বছর বয়সী হানান আবু আল-মাআজা যুদ্ধের সময় ১২ বারেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরায়েলের নতুন সরকার গাজার মানুষের ওপর আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে— এমন আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
হানান বলেন, ভয় ও উদ্বেগ থেকেই তারা ইসরায়েলের নির্বাচন অনুসরণ করছেন। রাতে ঘুমাতে গেলেও নিরাপত্তার অনুভূতি থাকে না। পরদিন তাঁদের ওপর কী নেমে আসবে, সেই দুশ্চিন্তা সব সময় তাড়া করে বেড়ায়।
নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করেন তিনি। তার বাড়ি উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায়।
হানানের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব গাজার মানুষের দুর্দশা উপলব্ধি করে যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার উদ্যোগ নেবে।
তিনি বলেন, গাজায় ধ্বংস করার মতো প্রায় কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তারপরও মানুষের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো যুদ্ধ বন্ধ করে মানুষকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার সুযোগ দেওয়া।
উত্তর গাজার বাসিন্দা ২৩ বছর বয়সী মানার ওয়াইদা বর্তমানে গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। ইসরায়েলের নির্বাচনী প্রচার এবং সম্ভাব্য নতুন সরকারের পরিকল্পনার দিকে নজর রাখছেন তিনিও।
ওয়াইদার আশা, গাদি আইজেনকট নেতানিয়াহুর স্থলাভিষিক্ত হলে গাজার পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। তবে তার মতে, ইসরায়েলের নীতি কয়েক দশক ধরেই একই রকম রয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও অবরোধের যে অভিজ্ঞতা, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
তারপরও নতুন সরকার অবরোধ ও হামলা কমাবে, ‘ইয়েলো লাইন’-এর বাইরে থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং গাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করবে— এমন প্রত্যাশা রয়েছে তার।
তবে নির্বাচনের সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এড়াতে নেতানিয়াহু বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত শুরু করতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন ওয়াইদা।
তিনি বলেন, তারা ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছেন। তাদের চাওয়া খুবই সাধারণ— স্বাধীনতা ও শান্তিতে বেঁচে থাকা, যেন আর হত্যা ও যুদ্ধের মুখোমুখি হতে না হয়।
উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত মানার ওয়াইদা ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে নজর রাখছেন। এই নির্বাচনের ফল ফিলিস্তিনিদের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। ছবি : আল জাজিরা
বাস্তুচ্যুতদের ঘরে ফেরার প্রশ্ন
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৩ বছর বয়সী মুসা আলী বর্তমানে চার সন্তানকে নিয়ে গাজা সিটিতে বসবাস করছেন। তার মতে, ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা নিজেদের এলাকায় ফিরতে পারবেন কি না।
তিনি আশা করেন, বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় এলে বাস্তুচ্যুতদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারে আরব দলগুলো ভালো ফল করে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে বলেও প্রত্যাশা তার।
তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী এলেই গাজার পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন না আলী। তার আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় এলে বাস্তুচ্যুতি ও ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
আলী বলেন, গাজায় প্রতিদিন মানুষ নিহত হচ্ছেন, রক্তপাত হচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা চলছে। তিনি চান, এই নীতির অবসান হোক এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী চলমান রক্তপাত বন্ধ করুন।
অনিশ্চয়তার মধ্যেও ক্ষীণ আশা
গাজার বাসিন্দাদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট— ইসরায়েলের নির্বাচনের ফলাফল তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করেন। কিন্তু শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ, অবরোধ, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞের অবসান হবে, এমন বিশ্বাস তাদের অনেকেরই নেই।
কারও প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব কিছুটা কম কঠোর হবে। কেউ চান সীমান্ত খুলে দেওয়া হোক, সেনা প্রত্যাহার করা হোক এবং পুনর্গঠন শুরু হোক। আবার অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিনের নীতিতে পরিবর্তন না এলে নতুন সরকারও তাদের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে পারবে না।
বছরের পর বছর যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা গাজার মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদকে অনেকটাই ক্ষীণ করে দিয়েছে। তবু ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝেও তাদের প্রত্যাশা একটাই— যুদ্ধ বন্ধ হোক, নিরাপত্তা ফিরে আসুক এবং তাঁরা যেন নিজেদের ঘরে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারেন।