ফ্রান্সের পথে পথে ক্ষোভের আগুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছে ৪ থেকে ৮ লাখের বেশি মানুষ। বিক্ষোভের শেষ

2026-10-26T03:30:16+00:00
2026-10-26T03:30:16+00:00
 
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ফ্রান্সের পথে পথে ক্ষোভের আগুন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩০ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছে ৪ থেকে ৮ লাখের বেশি মানুষ। বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে রাজধানী প্যারিসে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের জন্য এটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা এপি।

প্রতিবেদন বলছে, প্যারিসের বিক্ষোভ মিছিলটি শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। যদিও এর এক সপ্তাহ আগে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় ব্যাপক দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তবে পূর্ব প্যারিসে মিছিলের নির্ধারিত সমাপ্তিস্থলের কাছে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। পুলিশ সদস্যরা মাইকে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার আহ্বান জানায়। কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার বিক্ষোভকারীদের মধ্যে এসে পড়লে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করতে করতে দিগি¦দিক ছুটতে থাকেন। আবার অনেক বিক্ষোভকারী চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘দৌড়াবেন না!’

ফরাসী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। গত সপ্তাহান্তে এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার। তবে শনিবারের বিক্ষোভের আয়োজকদের একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক সংগঠন সিজিটি জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্যারিসে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল এড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে মিছিলের অনুমতি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে সিজিটির হিসাবে প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেন ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ।

ম্যাক্রোঁর শেষ সময়ে অস্থিরতা : ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে। আগামী বছরের মে মাসে ভোটাররা তার উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন। এর আগে তার প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ কয়েক মাসে এই অস্থিরতা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়ছে। কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালি পার্টি অভিযোগ করেছে, ম্যাক্রোঁর সরকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষুব্ধ মানুষকে আগামী নির্বাচনে দলটির প্রার্থী মেরিন লে পেনের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পুলিশের দমন-পীড়নের সমালোচনাও করেছেন। পুলিশী নিপীড়নে কয়েকজন কিশোর বিক্ষোভকারী অঙ্গহানির মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জীবন বদলে দেওয়া শারীরিক আঘাত পেয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত ২৮৯টি বিক্ষোভের কয়েকটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। মার্সেই ও লিওঁ শহরের রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, লিওঁ, ক্লেরমঁ-ফেরঁ, স্ত্রাসবুর্গ ও বোর্দো শহরে কাঁদানে গ্যাস এবং নিস ও নঁতে শহরে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।

নিস শহরের কেন্দ্রস্থলে কট্টর ডানপন্থিদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, পুলিশ প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেফতার করেছে। তবে গ্রেফতারের হিসাব হালনাগাদ করার পর এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। নুনেজ বলেন, গত সপ্তাহের শেষদিকের মতো ব্যাপক লুটপাট ও দোকানপাটে ভাঙচুর ঠেকাতে এবার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। 

প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য সামরিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তার মতে, এই পদক্ষেপের ফলে গত সপ্তাহের মতো ব্যাপক সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।


ছোট বিক্ষোভ থেকে জাতীয় আন্দোলন : গত মাসে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মী সংকটের প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এতে যোগ দেন শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে দিশাহারা শ্রমজীবী মানুষও বিক্ষোভে শামিল হন। প্যারিসে ৪৬ বছর বয়সি শিক্ষিকা বেনেডিক্ট পিতিওঁ তার ১৬ বছর বয়সি মেয়ে গারঁসকে নিয়ে মিছিলে অংশ নেন। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গারঁসের সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রথম যৌথ বিক্ষোভ। পিতিওঁ বলেন, যেসব তরুণ বিক্ষোভ করছে, তাদের কথা শোনা হয়নি। তাই একজন অভিভাবক ও শিক্ষিকা হিসেবে আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।

আগের সপ্তাহের সহিংসতার দৃশ্য দেখে ‘ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন’ বলে জানায় গারঁস। তার মতে, ভয় পেয়ে বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকলে তা সরকারের জন্য জয় বয়ে আনত। শুক্রবার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংস্কার আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা না করা পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।

বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা : লাল রঙের সিজিটি ট্রেড ইউনিয়নের পোশাক পরা ৫৮ বছর বয়সি নার্স সৌমায়া আবেদ অভিযোগ করেন, প্যারিসের কেন্দ্রস্থল থেকে দূরে শহরের এক প্রান্তে মিছিল করার ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন দমিয়ে রাখতে চাইছে। বিক্ষোভের কারণে ল্যুভরসহ রাজধানীর কয়েকটি প্রধান জাদুঘরও বিশেষ ব্যবস্থায় বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, কিন্তু এতে আন্দোলন থামবে না। 

বিদ্যালয়ে উন্নত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও বন্ধ হবে না। ম্যাক্রোঁর শাসনামলে দারিদ্র‍্য ও সম্পদের বৈষম্য রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। ২৭ বছরের ক্যামিল শেনিয়ে জানান, প্রকৌশলে ডিগ্রি এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো চাকরি পাননি। তিনি বলেন, আমার মতো একই পরিস্থিতিতে থাকা অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাদের কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেই। তারা রাস্তায় কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তার ভাষায়, সত্যি বলতে পরিস্থিতি খুবই কঠিন।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   ফ্রান্স  আগুন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: