তেল আবিবের উপর পারমাণবিক হামলার একটি এআই-সৃষ্ট ছবি, যা ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছে। ছবি : সংগৃহীত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগে ইরানকে ঘিরে আতঙ্ক ছড়ানো এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগ উঠেছে। এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় ফিরতে না পারলে ইসরায়েল ‘দ্বিতীয় হলোকাস্টের’ মুখে পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর প্রকাশিত পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি তেল আবিবের ওপর পারমাণবিক বিস্ফোরণের মেঘের ছবিও ছিল।
রোববার, নির্বাচনের দুই দিন আগে, নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই পোস্ট দেন। তার বক্তব্যের সারকথা ছিল, তিনি ক্ষমতায় থাকলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবেন। তবে বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধটির লেখকের মতে, নেতানিয়াহু নির্বাচনে জয়ী হতে এমন ভয়ভীতি প্রদর্শনকেও যথেষ্ট মনে করছেন না।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ইরান-সংশ্লিষ্ট একটি অনির্দিষ্ট সামরিক পদক্ষেপ নিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ওপর চাপ দিচ্ছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এমন পদক্ষেপের ফলে ভুল হিসাব-নিকাশ থেকে নতুন সংঘাত শুরু হতে পারে।
রোববার রাতে চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আইডিএফের প্রধান এয়াল জামির ওই পদক্ষেপ নিতে আপত্তি জানাচ্ছেন এবং নেতানিয়াহুর কাছে আরও বিস্তারিত আলোচনা ও স্বাক্ষরিত আইনি অনুমোদন চেয়েছেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর নেতানিয়াহু একে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দেন।
সোমবার সকালে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা ইসরায়েলের নেই। তবে ইরান ইসরায়েলে হামলা চালালে শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধটির লেখক উল্লেখ করেছেন, চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে ইরানে সরাসরি হামলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়নি; বরং এমন একটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যা ইরানকে পাল্টা হামলায় প্ররোচিত করতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের ঠিক আগে বা নির্বাচনের দিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হলে ভোট স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত সপ্তাহে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান সিরিয়া ও ইরাকের ওপর দিয়ে ইরানের সীমান্তের দিকে উড়েছিল। হামলার প্রস্তুতির মতো মনে হওয়া ওই উড্ডয়ন ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশের কিছু আগে থেমে যায়। একাধিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ইরানকে নির্বাচনের আগে হামলা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে শক্তি প্রদর্শন ছিল এই পদক্ষেপের লক্ষ্য।
এদিকে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্প এ ধরনের হামলায় সম্মতি দেননি। ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনকে জামির সতর্ক করেছিলেন, নতুন হামলা হলে ইসরায়েলের নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সংঘাতের বিষয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্রদের স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য নেই।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক আইডিএফ প্রধান গাদি আইজেনকট রোববার রাতে চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এক বক্তব্যে বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে নেতানিয়াহু কোনো মিথ্যা বা চরম পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবেন না বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিবেদনটি প্রচারের পর আইজেনকট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় নয় এবং দেশটির নাগরিক ও সেনাদের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখা যায় না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলেন, ‘তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।’
নিবন্ধটির লেখকের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার সঙ্গে এক করে দেখছেন। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে সংঘাতের পরও তিনি এখন নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে পারেন বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। লেখকের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের পেছনে স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন না থাকলেও ক্ষমতায় থাকার স্বার্থই নেতানিয়াহুর কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
সূত্র : টাইমস অব ইসরায়েল
সময়ের আলো/জেডি