ভূমিকম্পে পা হারানো কারিনা বেচারা। ক্যাথরিন এলিস/আল জাজিরা ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন রিকার্ডো কনট্রেরাস। তার বাঁ পায়ের ওপর ভেঙে পড়েছিল দরজার কাঠামো। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় পায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বাঁচতে গিয়ে হারাতে হয় একটি পা। সেই বিপর্যয়ে মা-বাবাকেও হারিয়েছেন তিনি। তবে বেঁচে গেছে ছোট ভাই আন্দ্রেস। সবকিছু হারানোর মধ্যেও ভাইয়ের বেঁচে থাকাকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন ২৪ বছর বয়সি রিকার্ডো।
ভূমিকম্পের চার মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখন কারাকাসের একটি ছোট কর্মশালায় বসে নিজের নতুন কৃত্রিম পায়ের জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন, শিখছেন আবারও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করার কৌশল। ক্রাচে ভর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছেন, যোগ দিয়েছেন পরিবারের ট্রাকের যন্ত্রাংশের ব্যবসার কাজেও। কিন্তু হারানো পা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা যতটা কঠিন, মা-বাবাকে হারানোর শূন্যতা সামলানো তার চেয়েও কঠিন।
ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে হাজারো মানুষ প্রাণ হারান। সরকারি হিসাবে, মৃতের সংখ্যা ৬ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। আহত অন্তত ২ লাখ ২৬ হাজার ৬৯৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। অনেকেই হারিয়েছেন হাত-পা, কেউ হারিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের, আবার কারও মাথার ওপর থেকে সরে গেছে ঘরের ছাদ। দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক ধাক্কা পেরিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর সামনে এখন দীর্ঘ পুনর্বাসন, চিকিৎসার ব্যয়, মানসিক আঘাত এবং নতুন করে জীবন গড়ার কঠিন বাস্তবতা।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভূমিকম্পে অঙ্গ হারানো মানুষদের সেই লড়াইয়ের গল্প। সেখানে শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা যেমন আছে, তেমনি আছে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার অসহায়ত্ব এবং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।
ভাই বেঁচে আছে, এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন
ভূমিকম্পের রাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছিলেন রিকার্ডো ও তার ১৬ বছর বয়সি ছোট ভাই আন্দ্রেস। উদ্ধারের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটেছে। রিকার্ডোর বাঁ পা একটি ভেঙে পড়া দরজার কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে ছিল। পায়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা কেটে ফেলতে হয়।
কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজের পা হারানোর চেয়েও ছোট ভাইয়ের পরিণতি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। রিকার্ডোর কথায়, ‘সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো, আমরা বেঁচে গেছি। প্রথমে যখন জানতে পারলাম আন্দ্রেস ভালো আছে, তখন নিজের পা নিয়ে খুব একটা ভাবিনি। ভাই যেন ভালো থাকে, তার জন্য হাজারবার নিজের পা হারাতেও রাজি হতাম।’
ভূমিকম্পে তাদের মা-বাবা দুজনই মারা যান। ধসে পড়া ভবনের ভেতর উদ্ধার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। পরিবারের পোষা কুকুরটিও ধ্বংসস্তূপের নিচে মারা গেছে। একসময় সমুদ্রের দিকে মুখ করে থাকা যে বাড়িতে পরিবারটির জীবন কাটত, সেটিও এখন কেবল স্মৃতির অংশ।
মা-বাবাকে হারানোর স্মৃতি আজও রিকার্ডোকে তাড়া করে ফেরে। তিনি জানান, ভূমিকম্পের সময় মাকে জড়িয়ে ধরে বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে আন্দ্রেস ছিল বাবার কাছাকাছি। মা তাকে বলছিলেন, তিনি ঠিক আছেন। কিন্তু রিকার্ডো দেখতে পাচ্ছিলেন, মায়ের মাথার ওপর কংক্রিট ও দেয়ালের অংশ পড়ে আছে, চারদিকে ধুলা।
ভূমিকম্পের আগে মাকে মনে পড়ে রান্না করতে, গান গাইতে এবং পরিবারের পোষা কুকুরটিকে আদর করতে। বাবার কাছ থেকে শিখেছিলেন পরিশ্রমের মূল্য এবং কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত থাকার শিক্ষা। এখন ফোনে মা-বাবার ছবি দেখেই তাদের স্মৃতি ধরে রাখেন দুই ভাই। কোনো ছবিতে তাদের বাড়ি, কোনো ছবিতে সুইমিং পুলের পাশে পরিবারের সবাই।
রিকার্ডো বলেন, সময়ের সঙ্গে কান্না একই রকম থাকলেও তার কারণ বদলে যায়। শুরুতে ছিল শোকের কান্না, এখন অনেক সময় ভালো স্মৃতি মনে করেও চোখ ভিজে ওঠে।
নতুন পায়ে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় কারিনা
ভূমিকম্পে দুই পা হারিয়েছেন কারিনা বেচারা। দুর্ঘটনার আগে নিজের ব্যবসা চালাতেন তিনি। ব্যস্ত জীবন সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত উচ্চমাত্রার ক্রসফিট শরীরচর্চা করতেন। তার সন্তানদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বাবলম্বী মা, যিনি নিজের কাজ নিজেই করতে পারতেন।
কিন্তু ভূমিকম্পের পর সেই জীবন একেবারে বদলে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে ২৩ ঘণ্টা আটকে ছিলেন কারিনা। ভারী আসবাব তার দুই পা চেপে ধরেছিল। দীর্ঘ সময় পর উদ্ধার হলেও পা দুটি আর রক্ষা করা যায়নি।
এখন হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয় তাকে। যিনি আগে নিজের ব্যবসা ও পরিবার সামলাতেন, তাকে এখন সন্তানদের সাহায্য নিতে হচ্ছে। কারিনার ভাষায়, ‘এখন আমি ঠিক তার উল্টো। এমন একজন মা, যাকে সন্তানদের সাহায্য নিতে হয়, অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।’
তবু আশা ছাড়েননি তিনি। আগামী ১ ডিসেম্বর নতুন কৃত্রিম পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করেছেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সেই লক্ষ্যই তাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। কারিনা বলেন, দিনগুলো কষ্টের, কখনো কখনো আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এমন দিনে তিনি কাঁদেন, কিন্তু চেষ্টা করেন সামনে তাকিয়ে থাকতে। কারণ, নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে না পারলে অন্য কেউ তা দেখিয়ে দেবে না।
কারিনার এই অপেক্ষা কেবল কৃত্রিম পায়ে দাঁড়ানোর নয়। এটি নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার, সন্তানদের কাছে আবারও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার এবং পরিচিত জীবনে ফেরার অপেক্ষা।
কৃত্রিম পা পেলেই শেষ নয় পুনর্বাসন
কারাকাসের অর্টোপ্রোটেকনিকা নামের একটি কর্মশালায় ভূমিকম্পে অঙ্গ হারানো মানুষদের কৃত্রিম হাত-পা তৈরি ও পুনর্বাসনে সহায়তা করছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক বিয়াঙ্কা দামাসো। তার মতে, অঙ্গ হারানোর পর প্রত্যেকের সুস্থ হয়ে ওঠার পথ আলাদা। কারও ক্ষত দ্রুত শুকায়, কারও সময় লাগে বেশি। আগের শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যাও পুনর্বাসনের সময়কে প্রভাবিত করে।
সাধারণত কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হতে দুই থেকে তিন মাস ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন ও শারীরিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। তবে ক্ষত পুরোপুরি না শুকালে কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহারের চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক রোগী দ্রুত কৃত্রিম পা পেতে চান, কিন্তু শরীর প্রস্তুত না থাকলে তাদের অপেক্ষা করতে হয়।
কৃত্রিম পা তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন। দামাসো জানান, কৃত্রিম হাঁটুর জন্য শতাধিক ধরনের বিকল্প রয়েছে। ত্বকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার জন্য রয়েছে ২০০টিরও বেশি রঙের বিকল্প। রোগীর শারীরিক গঠন, প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী উপযুক্ত কৃত্রিম অঙ্গ নির্বাচন করতে হয়।
তবে প্রথমবার কৃত্রিম পা পরানোই শেষ ধাপ নয়। শিশুদের শরীর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত কৃত্রিম অঙ্গ বদলাতে হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদেরও নিয়মিত সমন্বয়, মেরামত ও প্রয়োজনে নতুন অঙ্গের প্রয়োজন হয়। ফলে পুনর্বাসনের সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও ব্যয়ের চাপ।
শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক সংকটও কম নয়। ভূমিকম্পে অঙ্গ হারানো অনেকে ভাবছেন, তারা আর কখনো হাঁটতে পারবেন কি না, হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হবে কি না, কিংবা নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো একা সামলাতে পারবেন কি না। কেউ কেউ ভবিষ্যতে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলা বা জীবনসঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
দামাসোর ভাষায়, এসব মানুষের লড়াই শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। তাই তার কর্মশালায় একটি নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়। সেখানে কাউকে ‘আমি পারব না’ বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়। পুনর্বাসনের লক্ষ্য শুধু কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার শেখানো নয়, বরং নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাও।
কৃত্রিম অঙ্গের দাম কয়েক হাজার ডলার
ভেনেজুয়েলার জুয়ান পাবলো দস সান্তোস ফাউন্ডেশন ভূমিকম্পে অঙ্গ হারানো ব্যক্তিদের সহায়তায় কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জুয়ান পাবলো দস সান্তোস নিজেও একসময় দুর্ঘটনায় দুই পা হারিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনার পর তার জীবন বদলে যায়। পরে তিনি ক্রীড়াবিদ ও মডেল হিসেবে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন।
ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে গিয়ে তিনি প্রথম যে হাসপাতালে যান, সেখানে ১২ শিশুকে দেখেন। তাদের কেউ অঙ্গ হারিয়েছে, কেউ আবার অঙ্গচ্ছেদের অপেক্ষায় ছিল। দস সান্তোসের কাছে দৃশ্যটি ছিল হৃদয়বিদারক। কারণ, শিশুদের শুধু শরীরের একটি অংশই হারাতে হয়নি; অনেকের পরিবার, বাড়ি, স্কুল ও পরিচিত জীবনও ধ্বংস হয়ে গেছে।
শিশুদের সামনে অঙ্গ হারানোর পরও জীবন কীভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, তার উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এবং অর্জনের কথা বলে তাদের আশাবাদী করতে চেয়েছেন। তবে শারীরিক ও মানসিক পুনর্বাসনের পাশাপাশি তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে কৃত্রিম অঙ্গের খরচ।
দস সান্তোস জানান, হাঁটুর নিচ থেকে পা কেটে ফেললে ব্যবহারের উপযোগী কৃত্রিম অঙ্গের দাম ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার। হাঁটুর ওপর থেকে পা কেটে ফেললে খরচ বেড়ে ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। শরীরের পেশির সংকেতের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে এমন ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিযুক্ত কৃত্রিম অঙ্গের দাম আরও বেশি, কখনো কয়েক দশ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।
ভূমিকম্পের আগেই ফাউন্ডেশনটির কাছে শত শত মানুষের তালিকা ছিল, যারা কৃত্রিম অঙ্গের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে তা কিনতে পারছিলেন না। ভূমিকম্পের পর নতুন করে প্রায় ২০০ জনের নাম যুক্ত হয়েছে সেই তালিকায়।
ফাউন্ডেশনটি সবচেয়ে দামি প্রযুক্তির কৃত্রিম অঙ্গের বদলে কার্যকর ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিকল্পের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, কৃত্রিম অঙ্গ কিনতে পারলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত মেরামত, সমন্বয় ও পরিবর্তনের খরচও বহন করতে হয়। যেসব পরিবারের নিয়মিত আয় নেই, তাদের পক্ষে এত দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।
এ কারণে ভেনেজুয়েলায় বিশেষায়িত অর্থোটিকস ও প্রোস্থেটিকস কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে ফাউন্ডেশনটি। তাদের লক্ষ্য, কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহারকারীদের এককালীন সহায়তার বদলে দীর্ঘমেয়াদি সেবা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
বিনা মূল্যের চিকিৎসাতেও আছে নানা খরচ
ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক সংকটের চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভূমিকম্প সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে। গুরুতর আহত ব্যক্তি বা অঙ্গ হারানো রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হলেও তার সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া তখনই শেষ হয় না। বরং এরপর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসন, নিয়মিত চিকিৎসা ও বাড়তি খরচের সময়।
কারাকাস নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনা রোসারিও বলেন, রোগী বেঁচে যাওয়া ও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও চিকিৎসার অনেক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। রোগীর তুলনায় নার্সের সংখ্যা কম থাকে। হাসপাতালগুলোকে কখনো কখনো ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠনের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
দেশটিতে স্বাস্থ্যসেবা আনুষ্ঠানিকভাবে বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীদের ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জাম, পরীক্ষা, যাতায়াত ও পুনর্বাসনের খরচ বহন করতে হয়। এসব ব্যয় মাসের পর মাস চলতে পারে।
রোসারিওর ভাষায়, অর্থের অভাবে অনেক পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহায্য চায়, অনুদান সংগ্রহ করে, ঋণ নেয় অথবা চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। কোনো পরীক্ষা, ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতি দেরিতে শুরু হলে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়। কখনো দেখা দেয় নতুন জটিলতা।
রিকার্ডোর মতো কিছু মানুষ জুয়ান পাবলো দস সান্তোস ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত অনুদানের মাধ্যমে কৃত্রিম অঙ্গ ও পুনর্বাসনের খরচ মেটাতে পারছেন। নিজের কৃত্রিম পা তৈরির কাজ দেখতে পেরে উচ্ছ্বসিত রিকার্ডো। কয়েক দিন আগে সেটি তৈরি হতে দেখেছেন তিনি। এখন আবার হাঁটতে পারার স্বপ্ন তার কাছে আরও বাস্তব মনে হচ্ছে।
নিজের শারীরিক পুনর্বাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ও ব্যবসার কাজ সামলানোর পাশাপাশি ছোট ভাই আন্দ্রেসের দায়িত্বও নিয়েছেন রিকার্ডো। মা-বাবার মৃত্যুর পর তিনি এখন ভাইয়ের আইনগত অভিভাবক। দুই ভাই একে অপরের যত্ন নিয়ে ধীরে ধীরে নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে। তিনতলা ভবন এবং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে দীর্ঘ দূরত্বের কারণে শুরুতে ক্লাসে ফেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন রিকার্ডো। কিন্তু তার শিক্ষকেরা ক্লাস নিচতলায় সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, যাতে তার চলাফেরায় সুবিধা হয়। সহপাঠীরাও পাশে দাঁড়িয়েছেন।
রিকার্ডো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে তার ভালো লেগেছে। সহপাঠীরা সব সময় তাকে সাহায্য করেছেন। ভাইয়ের চোখেও প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছেন তিনি। আন্দ্রেসের মতে, হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে পারাটাই ছিল বড় অগ্রগতি। এখন প্রতিদিন তার ভাই আরও ভালো হয়ে উঠছেন, আর সেটিই তাকে আনন্দ দেয়।
ভূমিকম্পের পর ভাইয়ের আইনগত অভিভাবক হওয়ার পাশাপাশি রিকার্ডো নিজের পড়াশোনা শেষ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে পূর্ণ বৃত্তিও পেয়েছেন। এতে পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। সরকার পরিচালিত ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের আবাসন কর্মসূচির মাধ্যমে দুই ভাইয়ের নিজেদের একটি বাড়ি পাওয়ার আশাও রয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। ভেনেজুয়েলায় বেসরকারি খাতের একজন কর্মীর গড় মাসিক বেতন ২০০ ডলারের সামান্য বেশি। ভূমিকম্পের পর পরিবারের ব্যবসার কাজও কমে গেছে। ফলে চিকিৎসা, দৈনন্দিন জীবন ও ভবিষ্যতের খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন রিকার্ডো।
তিনি বলেন, সবকিছুর পরও কখনো কখনো খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবু তারা কোনো না কোনোভাবে পথ খুঁজে নেন। তার বিশ্বাস, ভেনেজুয়েলার মানুষ এমনই, কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা কোনোভাবে সবকিছু সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
সুস্থ হওয়ার লড়াই চলবে দীর্ঘদিন
ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া মানুষদের জন্য সামনে পথটি সহজ নয়। কারও প্রয়োজন কৃত্রিম অঙ্গ, কারও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, আবার কারও প্রয়োজন মানসিক সহায়তা ও নিরাপদ বাসস্থান। শিশুদের ক্ষেত্রে অঙ্গের পরিবর্তন ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন দীর্ঘ সময় চলতে পারে। আর্থিক সহায়তা কমে গেলে এই মানুষগুলোর জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের প্রয়োজন ছিল ৬ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। কিন্তু সংস্থাটি পেয়েছে মাত্র ২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় অর্থের ৫৫ শতাংশের ঘাটতি রয়েছে। একই মাসে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, দেশটিতে তাদের সহায়তা কার্যক্রমের মাত্র ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুদানও কমেছে, অথচ ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজন রয়ে গেছে।
রিকার্ডোর সামনে এখন একসঙ্গে অনেক দায়িত্ব। নতুন কৃত্রিম পায়ে হাঁটা শিখতে হবে, পড়াশোনা শেষ করতে হবে, পরিবারের ব্যবসা সামলাতে হবে এবং ছোট ভাইকে নিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধতে হবে। এর পাশাপাশি বয়ে বেড়াতে হবে মা-বাবাকে হারানোর শোক। ভাই আন্দ্রেসের সহায়তা তাকে এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে শক্তি জোগাচ্ছে।
আন্দ্রেসের কাছে ভাইয়ের প্রতিটি অগ্রগতি আনন্দের। আর রিকার্ডোর কাছে ছোট ভাই যেন এক বিশ্বজয়ীকে অনুভব করায়। কথাটি বলতে গিয়ে হাসেন তিনি, পাশে থাকা আন্দ্রেসের মুখেও ফুটে ওঠে হাসি।
হারানো পা, মা-বাবা ও বাড়ি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু চিকিৎসা, সহায়তা ও পরস্পরের পাশে থাকার মধ্য দিয়ে নতুন জীবনের পথ তৈরি করার চেষ্টা করছেন তারা। ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া এসব মানুষের কাছে সুস্থ হয়ে ওঠা মানে শুধু আবার হাঁটতে পারা নয়; বরং হারানো পৃথিবীর ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে বেঁচে থাকার নতুন কারণ খুঁজে নেওয়া।
সময়ের আলো/জেডি