ইসরায়েলের একজন ফিলিস্তিনি নাগরিক আল-রুস পাহাড়ের চূড়া থেকে গ্যালিলির মাজদ আল-ক্রুমের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবি : আল জাজিরা গ্যালিলিতে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ ঠেকিয়েছেন ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। তবে নির্বাচনের পর নতুন করে উসকানি ও ভূমি দখলের আশঙ্কা করছেন তারা।
ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের মাজদ আল-ক্রুম গ্রামের পাশের পাইনগাছে ঢাকা পাহাড়টির নাম আল-রুস। গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে পাহাড়টিতে উঠতে শুরু করেন স্থানীয় ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা। কেউ ঘোড়ায় চড়ে, কেউ চার চাকার গাড়িতে, আবার কেউ হেঁটে খাড়া পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছান। তাদের লক্ষ্য ছিল, নিজেদের গ্রামের জমিতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের গড়ে তোলা একটি অস্থায়ী আউটপোস্ট সরিয়ে দেওয়া।
অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে আসা একদল তরুণ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী কয়েক সপ্তাহ আগে সেখানে তাঁবু খাটিয়েছিল। তারা দাবি করে, ইহুদি জাতীয় তহবিলের (জেএনএফ) অনুমতি নিয়ে গবাদিপশু চরানোর জন্য সেখানে এসেছে। কিন্তু গ্রামের বাসিন্দা ও আইনজীবী হুসেইন মান্নার ভাষ্য, সেখানে কোনো গবাদিপশুই ছিল না। বরং কয়েক দিনের মধ্যে তাঁবুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তৈরি করা হয় রান্নাঘর, শৌচাগার, পানির সংযোগ ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা। গ্রামবাসীদের হিসাবে, এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জন বসতি স্থাপনকারী জড়ো হয়েছিল।
পুলিশ পাহাড়ে ওঠার রাস্তা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তাতে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের থামানো যায়নি। প্রতিদিন শত শত মানুষ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিতে পাহাড়ে উঠতে থাকেন। প্রায় এক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে ইহুদি জাতীয় তহবিল বসতি স্থাপনকারীদের তাঁবু সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জায়গাটি খালি হয়ে যায়।
আপাতত নিজেদের জমি রক্ষার লড়াইয়ে জয়ী হন গ্রামবাসীরা। কিন্তু তাদের আশঙ্কা, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়। ইসরায়েলের নির্বাচনের পর উগ্র ডানপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলে এমন তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। তাদের ভয়, গ্যালিলিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জমি ও বসতি লক্ষ্য করে শুরু হতে পারে নতুন অভিযান।
‘এটা ছিল পরীক্ষামূলক উদ্যোগ’
মাজদ আল-ক্রুমের বাসিন্দাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছেন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তিনি গ্যালিলি অঞ্চলকে ‘ইহুদিকরণ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। ইসরায়েলের এই উত্তরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফিলিস্তিনি নাগরিকের বসবাস। স্মোট্রিচ বলেছেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে যে ‘বিপ্লব’ তারা ঘটিয়েছেন, গ্যালিলিতেও তা পুনরাবৃত্তি করবেন।
গ্রামের বাসিন্দা ও অর্থনৈতিক পরামর্শক হুসেইন খালাইলির মতে, আল-রুসের ঘটনাটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। তার ভাষায়, ‘এটা অনেকটা পাইলট পরীক্ষা। যেন তারা দেখতে চেয়েছে, এখানে এমন কিছু করলে মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।’
ঘটনার খবর নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় কমিটি বৈঠকে বসে। স্থানীয় কাউন্সিলের সঙ্গে মিলে প্রতিদিন বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। আইনজীবী হুসেইন মান্না বলেন, আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি জনতার আন্দোলনই ফল এনে দিয়েছে।
আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২১ বছর বয়সি আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও তরুণ সংগঠক আনাস সগায়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে দেওয়া পোস্টে মানুষকে পাহাড়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাদের বার্তা ছিল, ‘কফি নিয়ে চলে আসুন। আমরা শুধু কফি খেতে যাচ্ছি, কারণ জমিটা আমাদের।’
আনাসের স্মৃতিতে গেঁথে আছে পাহাড়ে ওঠার একটি দৃশ্য। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে খাড়া পথ বেয়ে ওপরে উঠছিলেন তিনি। হাঁপিয়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই পাশে দেখতে পান আশির কোঠায় থাকা এক বৃদ্ধাকে। স্বামীর সঙ্গে হেঁটে পাহাড়ে উঠছিলেন ওই নারী। আনাস বলেন, শুধু নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে প্রায় ৫০ মিনিট ধরে পাহাড়ে উঠেছিলেন তারা।
মাজদ আল-ক্রুমের পাশাপাশি দেইর আল-আসাদ, আল-বিনা, সাখনিন, আরাব্বে এবং নাকাব অঞ্চল থেকেও মানুষ প্রতিবাদে যোগ দেন। আশপাশের কিছু ইহুদি সম্প্রদায়ের বামপন্থী বাসিন্দাও তাদের সঙ্গে সংহতি জানান। খালাইলির ভাষায়, সেখানে অভাবনীয় সংহতি দেখা গিয়েছিল।
কাছের একটি গ্রামের ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টান নারী হানান বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের যেসব খবর তিনি পড়তেন, সেগুলো আগে অনেক দূরের ঘটনা বলে মনে হতো। মাজদ আল-ক্রুমের ঘটনা সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। তার মতে, নিজেদের জমি রক্ষায় আরব সম্প্রদায়ের মানুষকে এতটা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে তিনি আগে দেখেননি।
পুলিশি উপস্থিতি নিয়ে স্মোট্রিচের প্রচার
রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় গ্রাম হিসেবে পরিচিত মাজদ আল-ক্রুমে প্রচারে এসেছিলেন স্মোট্রিচও। তার সঙ্গে ছিল পুলিশ বাহিনী ও জলকামান। গ্রামবাসীদের কেউ কেউ তার মুখোমুখি হতে চাইলেও স্থানীয় কমিটি ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের শান্ত করেন।
কিন্তু বসতি স্থাপনের উদ্যোগ থেমে গেলেও গ্রামটিকে ঘিরে উত্তেজনা কমেনি। ১৮ সেপ্টেম্বর পুলিশ জানায়, লেবাননের এক এজেন্টের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের অভিযোগে মাজদ আল-ক্রুমের ৩২ বছর বয়সি এক বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্মোট্রিচ এ ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে বলেন, গ্যালিলির বাসিন্দারা যেন ৬ অক্টোবরের পরিস্থিতিতে রয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার আগের দিনের পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করেই তিনি এ কথা বলেন।
গ্রামবাসীদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য ও ঘটনাকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
গত ২৭ আগস্ট স্মোট্রিচ গ্যালিলি ও নাকাবে আরও ১০ লাখ ইহুদি বসতি স্থাপন এবং ৪০টি নতুন ইহুদি সম্প্রদায় গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান। নাকাবেও বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নাগরিকের বসবাস। পরে তার দল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেখানে পশ্চিম তীরের এক ফিলিস্তিনিকে গ্যালিলিতে থাকা আত্মীয়কে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলতে দেখা যায়, ‘ইহুদিরা আসছে’, তারা তোমাদের সঙ্গে তা-ই করবে, যা আমাদের সঙ্গে করেছে।
আনাস ও তার বন্ধুরা প্রথমে ভিডিওটি দেখে হেসেছিলেন। তাদের কাছে বিষয়টি অবাস্তব মনে হয়েছিল। কিন্তু আল-রুসে বসতি স্থাপনের উদ্যোগ দেখে তাদের মনে হয়েছে, ভিডিওর আশঙ্কা যেন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
খালাইলি বলেন, আগে গ্যালিলির উন্নয়নের কথা বলা হতো, এখন ভাষা বদলে গেছে। স্মোট্রিচ প্রকাশ্যেই গ্যালিলিকে ‘ইহুদিকরণ’ করার কথা বলছেন। তার মতে, এই বক্তব্যের অর্থ আর অস্পষ্ট নয়।
জমি নিয়ে বিরোধ, সংঘাতের আশঙ্কা
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বসতি স্থাপনের উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু জমি দখল নয়, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। এরপর সেই সংঘাতকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
আইনজীবী মান্নার ভাষায়, বসতি স্থাপনকারীরা মানুষকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য বিশৃঙ্খলা তৈরি করা, কারণ বিশৃঙ্খলা তাদেরই সুবিধা দেয়।
বসতি স্থাপনকারীরা দাবি করেছিল, ইহুদি জাতীয় তহবিলের দেওয়া অনুমতি অনুযায়ী সেখানে পশু চরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু খালাইলির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮ দশমিক ৪ দুনাম বা আনুমানিক দুই একর জমির অর্ধেক তার এক চাচাতো ভাইয়ের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। বাকি অংশ ইসরায়েল ভূমি কর্তৃপক্ষের অধীনে। দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষ জমিটি ভাগ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেনি, ফলে মালিক নিজের জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করতে পারছেন না।
মান্নার মতে, মাজদ আল-ক্রুমকে বেছে নেওয়ার কারণও রয়েছে। ১৯৪৮ সালের নাকবার সময় গ্রামটির বহু বাসিন্দা বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই গ্রামটির মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের ঐতিহ্য রয়েছে। তিনি বলেন, মাজদ আল-ক্রুমকে যদি ভেঙে ফেলা যায়, তাহলে একই ঘটনা পুরো গ্যালিলিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পরে জেএনএফ জানায়, পশু চরানোর উদ্যোগটি প্রায় ৫০০ মিটার দূরের আরেকটি জমিতে সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু গ্রামবাসীরা ওই জমিকেও নিজেদের বলে দাবি করছেন। মান্না স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁবু একটি হলেও তারা অন্য কোথাও বসতি স্থাপনের উদ্যোগ মেনে নেবেন না।
এ বিষয়ে আল-জাজিরা ইহুদি জাতীয় তহবিল, ইসরায়েলি পুলিশ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পায়নি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা
মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে স্মোট্রিচ ক্ষমতায় থাকবেন কি না। নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রধান দুই জায়নবাদী রাজনৈতিক জোটের কোনোটিই আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পেতে পারে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটদানের হার ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে মাজদ আল-ক্রুমের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এবার এই হার ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছেন। ১৯৯৯ সালের পর এ হার এতটা উঁচুতে দেখা যায়নি। মান্নার অনুমান, এবারের নির্বাচনে তাদের গ্রামের ভোটদানের হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বর্জন করে আসা খালাইলিও এখন বিভিন্ন আলোচনায় মানুষকে ভোট দিতে উৎসাহিত করছেন। তার মতে, বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বর্ণবাদী হিসেবে পরিচিত নেতাদের অন্তত সাময়িকভাবে হলেও ক্ষমতা থেকে সরানো প্রয়োজন।
তবে তিনি মনে করেন, নেতানিয়াহুর সরকারের পরিবর্তে অন্য সরকার এলেও বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তার ধারণা, পার্থক্য শুধু এটুকু হতে পারে যে স্মোট্রিচ ও উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির নতুন সরকারে থাকবেন না।
অন্যদিকে আনাস সগায়ের এখনো নির্বাচন বর্জনের পক্ষে। তার মতে, আল-রুসের মতো ঘটনার সমাধান রাজপথে প্রতিবাদ করেই করতে হবে, পার্লামেন্ট বা আইন দিয়ে নয়। দুই প্রধান জায়নবাদী রাজনৈতিক জোটের মধ্যে তিনি খুব বেশি পার্থক্য দেখেন না। তার ভাষায়, ‘তারা এখানে ফিলিস্তিনিদের চায় না।’
ভয়, অপরাধ ও নীরবতার জীবন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার ভয় বেড়েছে। জীবিকা, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত উদ্বেগ অনেককে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। মাজদ আল-ক্রুমেও অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
খালাইলি বলেন, রাতে বাড়িতে বসে গুলির শব্দ শুনতে পান। তার সন্তানরা তিনজন মানুষকে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। অথচ এসব ঘটনার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় মানুষের কাছে পরিস্থিতিটি ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
তার মতে, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা এক কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের তুলনায় তাদের আইনি অধিকার বেশি হলেও যে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন, তার মধ্যেই তাদের বসবাস করতে হয়। তাই নিজেদের জমিতে থেকে যাওয়ার কারণে হারানোর ঝুঁকিও তাদের কাছে বড়।
খালাইলির ভাষায়, ‘আমাদের হারানোর সবচেয়ে বেশি কিছু আছে, কারণ আমরা নিজেদের জমিতে বসবাস করছি এবং এখানেই থেকে গেছি।’
আনাস বলেন, গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে তারা দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন। কিন্তু একসময় তার মনে হয়েছিল, এরপর তাদের পালা আসবে। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু ভাবিনি, এত তাড়াতাড়ি সেটা এসে যাবে।’
স্মোট্রিচের বক্তব্য ও বসতি স্থাপনকারীদের তৎপরতা নির্বাচনের প্রতি উদাসীন অনেক মানুষকেও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। মান্নার মতে, যারা ভোট দিতে চাননি, তারাও এখন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় ফিরলে কী অপেক্ষা করছে, তা তারা বুঝতে পারছেন।
তাঁবু সরেছে, পাহাড়ে ফিরেছে মানুষের পদচারণা
আল-রুসের পাহাড় থেকে বসতি স্থাপনকারীদের তাঁবু সরানো হয়েছে। সেখানে এখন পড়ে আছে কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবশিষ্টাংশ এবং হিব্রু ভাষায় লেখা একটি গ্রাফিতি, যার অর্থ ‘ইসরায়েল জাতি বেঁচে থাকুক’।
তবে গ্রামবাসীদের পাহাড়ে যাওয়া থামেনি। প্রতিদিনই পরিবারগুলো সেখানে যাচ্ছে। কেউ বারবিকিউ করছেন, শিশুরা ছবি আঁকছে, কেউ গান করছে। যে পাহাড়কে ঘিরে জমি হারানোর ভয় তৈরি হয়েছিল, সেই পাহাড়েই এখন নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখছেন তারা।
এক সপ্তাহের প্রতিবাদের দিনগুলোতে গ্রামের গায়ক খালেদ কেওয়ান সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে নেমে রেকর্ডিং স্টুডিওতে যেতেন। গ্রামের অন্য সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে মিলে তিনি ‘ইবন বিলাদি’ বা ‘আমার দেশের সন্তান’ নামে একটি গান তৈরি করেন।
গানে তিনি গেয়েছেন, ‘ও আমার ভূমি, আমার পূর্বপুরুষদের ভূমি! আমার দেশের ওপর যত দেয়ালই তৈরি করুক, আমি এই ভূমির সন্তান, আমি আমার নিজের দেশের সন্তান।’
গানটিতে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই মাজদ আল-ক্রুমের নাম উল্লেখ করেননি। কারণ, তার কাছে পুরো মাতৃভূমিই আপন। তিনি বলেন, হাইফা তার শহর, আক্কা তার শহর, সাখনিন ও আরাব্বেও তার শহর। তিনি পুরো মাতৃভূমিকে ভালোবাসেন।
খালেদের আশঙ্কা, ‘ইহুদিকরণ’ প্রচেষ্টা শুধু মাজদ আল-ক্রুমকে লক্ষ্য করে নয়, পুরো গ্যালিলিকে ঘিরেই এগোচ্ছে।
তাই বসতি স্থাপনকারীদের তাঁবু সরিয়ে নেওয়ার পরও গ্রামবাসীদের উদ্বেগ শেষ হয়নি। আপাতত তারা নিজেদের জমি রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তাদের কাছে পাহাড়ে প্রতিদিন ফিরে যাওয়া শুধু প্রতিবাদের স্মৃতি ধরে রাখা নয়, নিজেদের জমি ও পরিচয়ের ওপর অধিকার জানান দেওয়ারও একটি উপায়।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি