অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক নিজের বাড়ি ভেঙে ফেলার দৃশ্য দেখছেন এক ফিলিস্তিনি বাড়ির মালিক। ২৩ অক্টোবর ২০২৬। ছবি : রয়টার্স/মুসা কাওয়াসমা) বিয়ের আর দুই সপ্তাহও বাকি ছিল না। ২৩ বছর বয়সি মায়ার আমরিশ পরিবারের সঙ্গে নিজেদের বাড়ির প্রশস্ত উঠানে বসে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলছিলেন। সামনে নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় তাদের তিনতলা বাড়ি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় বাড়িটির বাইরে তখন ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল ইসরায়েলি বাহিনী। অভিযানকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ হিসেবে নিন্দা জানানো হয়েছে। শুক্রবারের এক গুলির ঘটনায় দুই ফিলিস্তিনি দুই ইসরায়েলি সেনাকে হত্যার পর এ অভিযান শুরু হয়।
এরপর হেবরন শহরে পূর্ণ অবরোধ আরোপ করে ইসরায়েলি বাহিনী। শুরু হয় বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, গ্রেফতার, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং বাসিন্দাদের জোর করে সরিয়ে দেওয়ার অভিযান। এতে হাজারো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
মায়ারের পরিবারও ছিল প্রথম দিকের লক্ষ্যবস্তুগুলোর একটি। গুলির ঘটনার স্থানটির কাছে বসবাস করাই ছিল তাদের ‘অপরাধ’।
শুক্রবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে ওই এলাকার বাড়িঘর লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে মায়ার কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ভেতর থেকে মনে হচ্ছিল, তারা বাড়িটি ভেঙে ফেলতে আসছে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। আমরা কয়েকটি কাপড় গুছিয়ে নেওয়ার আগেই সেনারা বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং আমাদের বেরিয়ে যেতে বলে।’
এর কয়েক দিন আগেই কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল পরিবারটি। ইসরায়েলি আদালত তাদের বাড়ি ভাঙার আদেশ স্থগিত করার কথা জানিয়েছিল। অধিকৃত পশ্চিম তীরের এরিয়া সি এলাকায় বাড়িটি নির্মাণ করায় বহু বছর ধরেই সেটি ভাঙার ঝুঁকিতে ছিল। এ অঞ্চলের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে।
২০২১ সালে বাড়ি নির্মাণের পর থেকে সেটি রক্ষায় প্রায় ৩০ হাজার শেকেল খরচ করেছিল পরিবারটি। এর বাইরে ছিল আইনি লড়াইয়ের খরচ ও জরিমানা। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। ইসরায়েলি বুলডোজার এসে তিনতলা বাড়িটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
প্রায় ৬০০ বর্গমিটারের বাড়িটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ শেকেল। সাত সদস্যের পরিবারকে আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। চোখের সামনে বছরের পর বছর পরিশ্রমের ফসল ধ্বংস হতে দেখে জ্ঞান হারান মায়ারের মা-বাবা।
এখন পরিবারের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। অন্য কোথাও থাকার জায়গা খুঁজছেন।
মায়ার বলেন, ‘সৌদি আরবে ২৫ বছর কাটানোর পর এই বাড়িটি ছিল আমাদের অর্জন। আমার বাবা প্রচণ্ড পরিশ্রম করে বাড়িটি বানিয়েছিলেন, যাতে শেষ পর্যন্ত নিজেদের শহরে স্থায়ীভাবে থাকতে পারি।’
অবরুদ্ধ হেবরন, ঘর ছাড়তে বাধ্য ৩ হাজারের বেশি মানুষ
শুক্রবারের গুলির ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ‘রোর অব জুডাহ’ নামে অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হেবরনের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি, অস্ত্র জব্দ, কথিত ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ শনাক্ত এবং বহু মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এ অভিযানের লক্ষ্য।
অভিযান শুরুর পর শহরের বিভিন্ন অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চালানো হচ্ছে তল্লাশি ও গ্রেপ্তার। এর মধ্যে ৩ হাজার ১০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, শহরে হামাসের কথিত অবকাঠামো ভেঙে না ফেলা পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের ফিরতে দেওয়া হবে না।
ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, অভিযান শুরুর পর হেবরনে ৪৭ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া শত শত মানুষকে ঘটনাস্থলেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
কমিশন অ্যাগেইনস্ট দ্য ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্টস জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট থাকা একটি ভবন ভেঙে দিয়েছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও দোকান। এর মধ্যে টাইলস ও সিরামিকসের একটি প্রতিষ্ঠান এবং গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানও রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় সাত দুনাম জমি বুলডোজার দিয়ে সমতল করা হয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হেবরনের পশ্চিমাঞ্চলের দেইর বাহা ও আল-জালাদা এলাকার বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শহরের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারি জানান, ৪৮৮টি পরিবারের ৩ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে।
শহরের সহায়তা ও ত্রাণ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে এক হাজারের বেশি শিশু, বহু বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী ও সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো নারী, প্রতিবন্ধী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন।
‘ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘর ছেড়েছি’
সহায়তা কমিটির হিসাবে, ১৯৮টি পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯টি পরিবার ভাড়া বাসায় উঠেছে এবং ২২টি পরিবার অন্যভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ১৭৭টি পরিবার জানিয়েছে, তাদের নিরাপদে থাকার কোনো জায়গা নেই।
৩৩ বছর বয়সি হামজা শাবানা স্ত্রী ও দুই বছর বয়সি মেয়েকে নিয়ে আইন দেইর বাহা এলাকার আটতলা একটি আবাসিক ভবনে থাকতেন। ভবনটিতে অন্তত ১৬০ জনের বসবাস ছিল।
শনিবার ভোরে ইসরায়েলি সেনাদের হুমকির মুখে পরিবারসহ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন হামজা। তার ভাষ্য, সেনারা ভবনটি ঘিরে লাউডস্পিকারে সবাইকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ভবনের ভেতরে শিশু ও বয়স্ক মানুষ থাকলেও তাদের পরিস্থিতির প্রতি কোনো বিবেচনা দেখানো হয়নি।
হামজা বলেন, ‘আমার স্ত্রী, মেয়ে ও আমি দুই দিনের জন্য যথেষ্ট কাপড় ছাড়া আর কিছুই নিতে পারিনি। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাড়ি ছেড়েছি।’
আল-জালাদা ও আইন দেইর বাহা এলাকার সড়কগুলোতে সেনারা অবস্থান নিয়ে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের কোথায় যেতে হবে, তা নির্দেশ করছিল। বাড়ি ছাড়ার পর থেকে হামজা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে থাকছেন। প্রতিরাতে বদলাতে হচ্ছে আশ্রয়স্থল।
তিনি বলেন, ‘কোনো স্থিতিশীলতা নেই। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবাই ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।’
হুমকিতে হেবরনের অর্থনীতি
অধিকৃত পশ্চিম তীরের সবচেয়ে জনবহুল গভর্নরেট হেবরন। ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে অঞ্চলটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৭৪ হাজার, যা ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
শহরটি একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও শিল্পকেন্দ্র। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, জুতা, পাথর ও মার্বেল, গয়না এবং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রতিষ্ঠান এখানে গড়ে উঠেছে।
কিন্তু সামরিক অভিযান এবং শহর ও প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। হেবরনের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ফেডারেশনের প্রধান আবদো ইদ্রিস বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়ন শেকেলে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি শেকেলে উঠতে পারে।
মেয়র আল-জাবারি বলেন, অভিযান শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিকেরা কাজে যেতে পারছেন না। পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহনেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে পৌরসভা। তবে অবরোধ অব্যাহত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় কর্মকর্তারা পৌঁছাতে পারছেন না বলে জানান মেয়র।
তার আশঙ্কা, অভিযান দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বাড়বে। কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকেরা মজুরি থেকে বঞ্চিত হবেন। এতে শহরটির আগে থেকেই চলমান অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট আরও গভীর হবে।
সম্পদ ও সক্ষমতা কমে এলেও বাসিন্দাদের সহায়তা, তাদের ঘরে থাকার সুযোগ তৈরি এবং বাস্তুচ্যুতদের ফিরিয়ে আনতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পৌরসভা বলে জানান আল-জাবারি।
প্যালেস্টাইন পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ইসলাম হাসুনা বলেন, অবরোধের কারণে পণ্য পরিবহন দুই দিক থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হেবরনের পণ্য পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলের বাজারে পৌঁছাতে পারছে না, আবার শহরে প্রয়োজনীয় সরবরাহও সীমিত হয়ে পড়েছে।
তার মতে, এতে শিল্প ও বাণিজ্য খাতের ক্ষতি আরও বাড়ছে। তবে ক্ষতির প্রভাব শুধু উৎপাদন ও বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অবরোধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে মানুষের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ এবং মানসিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও স্থবির করে তুলছে।
সময়ের আলো/জেডি