৬ বছরেও মেটেনি চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ, চাপে মোদির ভাবমূর্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

চীন ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলেও সীমান্তে উত্তেজনা কাটছে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশে চীনা সেনাদের

2026-10-27T20:05:41+00:00
2026-10-27T20:05:41+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
৬ বছরেও মেটেনি চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ, চাপে মোদির ভাবমূর্তি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০৫ পিএম 
২০০৩ সালের ৩১শে অক্টোবর, উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের ১১,০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত তাওয়াং-এ চীন সীমান্তের কাছে ভারতীয় সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
চীন ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলেও সীমান্তে উত্তেজনা কাটছে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশে চীনা সেনাদের সঙ্গে একাধিক অমীমাংসিত মুখোমুখি অবস্থান এখনো চলছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর। ছয় বছর আগে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর নতুন করে এই পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কঠোর অবস্থানের ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

গত সপ্তাহের শেষ দিকে কাপুরের এই বক্তব্য সামনে আসে। এর প্রায় চার মাস আগে অরুণাচল প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্থানীয় নাগরিক সংগঠনগুলো আল-জাজিরাকে জানিয়েছিল, চীনা বাহিনী ক্রমেই ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে এবং ভারতীয় সেনাদের কিছু টহলপথে যেতে বাধা দিচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

গত মাসে সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ভারত সফর করেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে এসে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধও দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোতে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে দুই নেতার সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকের মধ্যেও ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ অমীমাংসিত সীমান্তে চীনের কথিত অনুপ্রবেশ দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থানের ভাবমূর্তি গড়ে তোলা মোদির জন্যও এটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

আইটিবিপি প্রধান কাপুর জানিয়েছেন, অরুণাচল প্রদেশে চীনা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান এখনো চলছে। ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের হাতাহাতি সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার ছয় বছর পরও সীমান্তবিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

অমীমাংসিত সীমান্তবিরোধ

ভারত ও চীনের সীমান্তবিরোধের শিকড় ব্রিটিশ শাসনামলে নির্ধারিত ম্যাকমোহন লাইনে। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বত সিমলা কনভেনশনের মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারণ করে। তখন তিব্বত চীনের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত এই রেখাকে চীনের সঙ্গে নিজেদের সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পর চীন এই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে। বেইজিংয়ের যুক্তি, সিমলা কনভেনশনের আলোচনায় চীন অংশ নেয়নি।

চীন পুরো অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে অভিহিত করে। অন্যদিকে, ভারত ও পাকিস্তানের দাবির মধ্যে থাকা কাশ্মীরের আকসাই চিন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

১৯৬২ সালে দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে (এলএসি) নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার কার্যত সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে বৃহত্তর সীমান্তবিরোধ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকেও বিরোধের স্থায়ী নিষ্পত্তি হয়নি।

২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রমের অভিযোগ তোলে। ওই সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হন। পরে চীনও তাদের চার সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে।

স্যাটেলাইট চিত্র এবং ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাধিক বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, ওই সংঘর্ষের পর আগে বিরোধপূর্ণ থাকা কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ কার্যত চীনের হাতে চলে গেছে। তবে মোদি সরকার কোনো ভারতীয় ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেনি।

গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীনবিষয়ক নীতির স্বচ্ছতা নিয়ে মোদি সরকার বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়ে। সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সীমিত রাখা, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চীনা সেনাদের সমাবেশ সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পেরেছিল কি না এবং সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে।


২০২০ সালের ১৭ জুন গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে কথা বলেন। ওই ফোনালাপের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ভারতীয় অংশে গালওয়ান উপত্যকায় চীন একটি স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করেছিল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চীনের পূর্বপরিকল্পিত পদক্ষেপই সংঘর্ষ ও প্রাণহানির জন্য দায়ী।

কিন্তু দুই দিন পর মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘কেউ আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি, এখনো কেউ আমাদের ভূখণ্ডে নেই।’ তার এই বক্তব্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দল ও কৌশলগত বিশ্লেষকেরা। তবে মোদির দপ্তর পরে ব্যাখ্যা দেয়, সংঘর্ষের পর ভারতীয় ভূখণ্ডে চীনা সেনা অবস্থান করছে না, প্রধানমন্ত্রী সেটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন।

অরুণাচলে চীনা সেনা অবস্থানের অভিযোগ

অরুণাচল প্রদেশের প্রত্যন্ত আপার সুবানসিরি এলাকায় চীনা সেনারা ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন রাজ্যটির কংগ্রেস নেতা বসিরাম সিরাম। আগস্টে তিনি একটি দলীয় প্রতিনিধিদল নিয়ে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে যান। তার দাবি, ভারতীয় ভূখণ্ডে পাহাড়ের ওপর চীনা সেনারা অবস্থান করছে।

সিরাম বলেন, ‘আপনি চীনা সেনাবাহিনীকে দেখতে পাবেন। তারা পাহাড়ের ওপর, আর আমরা নিচে।’

আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, চীনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহলপথ থেকে সরে গেলে ভারত-চীন সীমান্ত এলাকায় মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি বিঘ্নিত হয়। তবে চলমান মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার সময়ও সীমান্তে উত্তেজনা অব্যাহত থাকা একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। তার ধারণা, এটি বেইজিংয়ের চাপ প্রয়োগের কৌশল হতে পারে। সীমান্ত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত না হওয়ায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হওয়া অনিবার্য বলেও মনে করেন তিনি।

দোন্থির মতে, মোদি সরকার জাতীয় নিরাপত্তায় শূন্য সহনশীলতার ভাবমূর্তি তুলে ধরে। কিন্তু চীনের সঙ্গে শক্তির ব্যবধান বড় হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তির জন্য বিব্রতকর হতে পারে, এমন ঘটনাকে তারা খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে।

স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনবিষয়ক অধ্যাপক বি আর দীপক বলেন, চীনের অনুপ্রবেশের অভিযোগ মোদির বিশ্বাসযোগ্যতা ও জবাবদিহির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

২০১২ সাল থেকে সীমান্তবিরোধ বড় সংঘাতে রূপ নেওয়া ঠেকাতে দুই দেশ একটি আনুষ্ঠানিক আলোচনাব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ভারত-চীন সীমান্তবিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন (ডব্লিউএমসিসি) সামরিক যোগাযোগের পাশাপাশি কাজ করে।

গত ৬ আগস্ট এই ব্যবস্থার ৩৬তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অরুণাচল প্রদেশে চীনা অনুপ্রবেশের খবর সামনে আসার প্রায় এক মাস পর বৈঠকটি হয়। সেপ্টেম্বরে অরুণাচল প্রদেশে প্রথমবারের মতো কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

দীপকের মতে, এসব বৈঠক সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে এবং পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু কয়েক দশকের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিরোধের কারণে তৈরি সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান শুধু সামরিক বা স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনায় সম্ভব নয়।

তার ভাষায়, দুই দেশের রাজধানী থেকে স্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনা ও সমন্বিত পদক্ষেপ না এলে সীমান্তে যেকোনো সমঝোতা ভঙ্গুর থেকে যাবে এবং পরিস্থিতি বদলালে তা আবারও ভেঙে পড়তে পারে। লাদাখের পর অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরির পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিই সামনে এনেছে।

সূত্র : আল জাজিরা 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   চীন  ভারত  সীমান্ত বিরোধ  মোদি  ভাবমূর্তি 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: