বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে টোলের নামে চাঁদার রশিদ। ছবি : সময়ের আলোসূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতিবছরই কুয়াকাটায় ছুটে যান দেশ-বিদেশের পর্যটকরা। তবে দেশের অন্যতম এই পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের প্রধান সড়ক বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে টোলের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। মহাসড়কের পাঁচটি স্থানে যানবাহন থামিয়ে টাকা আদায় করায় ক্ষোভ বাড়ছে পর্যটক, পরিবহনচালক ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গাড়িপ্রতি অতিরিক্ত ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ভাড়ায়ও।
সরেজমিনে জানা গেছে, বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত যাতায়াতকারী যানবাহনকে বরিশাল নগরীর রূপাতলী, পটুয়াখালী, আমতলী, কলাপাড়া ও কুয়াকাটায় বিভিন্ন নামে টোল দিতে হচ্ছে। এসব স্থানে সিটি ও পৌর টোলের নামে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস টার্মিনাল ব্যবহার না করলেও কিংবা গাড়িতে যাত্রী না থাকলেও টোল দেওয়া থেকে রেহাই মিলছে না। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি আটকে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীর রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডে ৫০ টাকা, পটুয়াখালী বাস টার্মিনালে ১০০ টাকা, আমতলী পৌর এলাকায় ১০০ টাকা, কলাপাড়ায় ৫০ টাকা এবং কুয়াকাটায় ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এসব স্থানে আদায়ের অঙ্ক মিলিয়ে গাড়িপ্রতি ৪০০ টাকা। তবে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি, অন্যান্য খরচসহ যাতায়াতের পথে গাড়িপ্রতি অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়।
পরিবহনসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, টোল আদায়ের সময় কোথাও রসিদে স্বাক্ষর থাকে, আবার কোথাও স্বাক্ষরবিহীন রসিদ দেওয়া হয়। টাকা আদায়কারীদের বিরুদ্ধে চালক ও সুপারভাইজারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। গাড়িপ্রতি এই বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নিতে পরিবহনমালিকেরা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থের চাপ গিয়ে পড়ছে যাত্রীদের ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা থেকে কুয়াকাটাগামী যানবাহনকে দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার গৌরনদী পৌরসভার ওপর দিয়ে যেতে হয়। সেখানে বাস টার্মিনাল থাকা সত্ত্বেও মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন থেকে টোল আদায় করা হয় না। উজিরপুর ও বাকেরগঞ্জ পৌরসভার ওপর দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রেও এমন টোল দিতে হয় না বলে জানা গেছে। তবে বরিশাল নগরীর রূপাতলী, পটুয়াখালী, আমতলী, কলাপাড়া ও কুয়াকাটায় ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহীম বলেন, মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী পরিবহন থেকে পৌর টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। এটি অন্যায়।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খোকন আহম্মেদ হীরা বলেন, পৌর টোলের নামে কীসের ভিত্তিতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে, তা স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে এভাবে টোল আদায়ের বৈধতা আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা উচিত।
গৌরনদী প্রেসক্লাবের সভাপতি জহুরুল ইসলাম জহির বলেন, গত ২২ অক্টোবর প্রেসক্লাবের ফ্যামিলি ডে উপলক্ষে সদস্য ও তাঁদের পরিবারের লোকজনকে নিয়ে কুয়াকাটায় গিয়েছিলেন তাঁরা। ফেরার পথে তাঁদের বহনকারী গাড়ি থেকেও পৌর টোল আদায় করা হয়। মহাসড়কে গাড়ি থামিয়ে এভাবে টোল আদায় কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, নগরীর রূপাতলী বাস টার্মিনাল এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস টার্মিনালের বাইরে সড়ক থেকে কাউকে টোল আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিটি টোলের নামে চাঁদা আদায়ের জন্য সড়ক ইজারা দেওয়া হয়নি।
আমতলী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানান, মহাসড়কে যানবাহন থেকে পৌর টোল আদায় বন্ধে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এরপরও কেউ টোল আদায় করছে কি না, তা তার জানা নেই। তবে এমন ঘটনা ঘটলে খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কলাপাড়া পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা কাব্য লাল চক্রবর্তী বলেন, শুধু কলাপাড়া বাসস্ট্যান্ড ইজারা দেওয়া হয়েছে, মহাসড়ক ইজারা দেওয়া হয়নি। মহাসড়কে বাস থামিয়ে টাকা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই।
কুয়াকাটা পৌরসভার ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট কারও যোগাযোগ নম্বর না পাওয়ায় এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ বলেন, মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে টোল আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই