খুলনায় ১০ মাসে ৭১ খুন, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতায় বাড়ছে অপরাধ

খুলনা ব্যুরো

সারাদেশ

খুলনায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনা

2026-10-28T17:19:47+00:00
2026-10-28T18:16:34+00:00
 
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,
১২ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
খুলনায় ১০ মাসে ৭১ খুন, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতায় বাড়ছে অপরাধ
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:১৯ পিএম  আপডেট: ২৮.১০.২০২৬ ৬:১৬ পিএম
খুলনায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি। ছবি : সময়ের আলো
খুলনায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় মোট ৭১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনাই ঘটেছে ২৩টি। এছাড়া অন্যান্যদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারনা করছে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতায় অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে।

এছাড়া খুলনা নগর ও জেলায় মোট হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে ৬৯টি। (একটি ঘটনায় তিনজন নিহত হওয়ায় মামলার সংখ্যা কিছুটা কম) হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ মাদকব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার আধিপত্য বিস্তার।

সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর খুলনা মহানগরীর মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় গুলিতে তুষার (২৭) নামে এক যুবক নিহত হন। একই দিন সন্ধ্যায় লবণচরা থানার জিন্নাপাড়ার বউবাজার এলাকায় মায়ের সামনে খুশি বেগম (২৫) নামে এক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এ ঘটনায় আশিক বাহিনীর সদস্যরা জড়িত। তবে অভিযোগের সত্যতা ও হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এর দুদিন পর, ২৪ অক্টোবর জেলার তেরোখাদায় এক যুবদল নেতাকে গুলি করে গুরুতর জখম করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন নগরীর সদর থানার টুটপাড়া এলাকায় একটি দোকানের ভেতরে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে আহত করা হয়। ওই রাতেই চাঁদা দাবি ও দখলের হুমকির পর সদর থানার বাবুখান রোডে সন্ধানী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও গুলির ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী সেখানে হামলা চালায়। রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতিতে এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এসব ঘটনার আগে-পরে নগরী ও আশপাশের এলাকায় গুলি, কুপিয়ে জখম, চাঁদা দাবি এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশ বলছে, মাদকসংক্রান্ত বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অনেক অপরাধ ঘটছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এসব কারণ চিহ্নিত করলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

খুলনার অপরাধ জগতের আলোচিত নামগুলোর একটি আশিক বাহিনী। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর চানমারী এলাকার আশিক ইসলামকে কেন্দ্র করে এ গ্রুপের বিস্তার ঘটে। তার ভাই সজীবের নামও বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগে এসেছে। আশিকের সহযোগী হিসেবে ফয়সালের নামও স্থানীয় অপরাধ জগতে আলোচিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফয়সালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

এ ছাড়া এমএস মিজান, আবদুল্লাহ, পালসার সোহেল, কাউট বাশার, জাহিদুল ইসলাম, হেলাল, নাদিম, ডালিম, পারভেজ, দুলাল, অপু, সাগর লেনিন, জিহাদ হোসেন জিয়া, আরমান, সাইফুল ইসলাম পিটিল, গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যারা মোস্তফা, ইয়াসিন, নিয়াজ মোর্শেদ, শেখ বাবুল ও স্পিকার মিরাজ, মাদক সম্রাট কানা মেহেদীসহ আরও কয়েকজনের নাম বিভিন্ন অভিযোগ ও অভিযানের প্রসঙ্গে এসেছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা ও প্রত্যেকের বর্তমান অপরাধসংক্রান্ত ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

গত ২৩ জুন লবণচরা এলাকা থেকে পারভেজ গাজী (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তিনি আশিক গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ শুটার হিসেবে পরিচিত। চলতি বছর বিভিন্ন সময়ে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে আশিক গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া গেছে। গত আগস্টে নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে শিবলি হোসেন রুবেল নামে এক ব্যক্তিকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ গ্রেফতারের কথা জানা যায়। চানমারী বাজার ও মতিয়াখালী এলাকায় অভিযানে ইমন শরীফ ও সজল খান এবং দেশীয় অস্ত্র ও ইয়াবাসহ ইয়াসিন নামে আরেক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের তথ্যও রয়েছে।

এসব অভিযানে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেলেও অপরাধী নেটওয়ার্কের সামগ্রিক কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী, অপরাধের অর্থের জোগানদাতা এবং গ্রেফতারের পর সহযোগীদের তৎপরতা অব্যাহত থাকার অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।

এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে মূলত ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম উঠে এসেছে। এরা এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করছে না।

রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি (পুরো শহরজুড়ে আধিপত্য), শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ (বর্তমানে প্রধান কারাগারে থাকলেও অনুসারীরা সক্রিয়), নূর আজিম গ্রুপ (খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকা), আশিক বাহিনী (খুলনা সদর ও লবণচরা এলাকা), হুমায়ুন কবিরের হুমা বাহিনী (দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকা), শেখ সাইদুর রহমান ওরফে শাওনের টেংকি শাওন গ্রুপ (সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুর), আরমান শেখের আরমান গ্রুপ (দৌলতপুর ও খানজাহান আলী এলাকা), শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ (প্রধান নাসিমুল গণি গত ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ায় গুলিতে নিহত হন।

পুলিশের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তালিকাভুক্ত অনেক অপরাধী জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও অপরাধজগতে সক্রিয় হয়ে উঠছে। এছাড়া সাধারণ মানুষও অপরাধীদের ভয়ে মুখ খুলতে চান না, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, সীমান্তপথ দিয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে। খুলনায় অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির পেছনে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা অন্যতম প্রধান কারণ।


কেএমপি এলাকায় অস্ত্র উদ্ধার : ২০২৪ সালে ২৪টি, ২০২৫ সালে ৪৭টি এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৩৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি বিদেশি পিস্তল ও ৭টি বিদেশি রিভলবার রয়েছে। নগর গোয়েন্দা পুলিশের অনুমান, খুলনায় এখনো অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সক্রিয় রয়েছে।

জেলা পুলিশের অভিযানে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে যুবদল ও শ্রমিক দলসহ বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনায় মাদকের বিস্তার এবং স্থানীয় আধিপত্যের কারণে গত দুই বছর ধরে মারামারি, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েকজনকে আটক করলেও অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, মাদকের বিস্তার রোধ এবং হানাহানি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব বিভাগ যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তার অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা খুলনার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নন। এ কারণেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক কুদরত-এ-খুদা বলেন, পুলিশের দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান ঘাটতির ফলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে মাদক, কিশোর গ্যাং এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র দুই মাস আগে। এ সময় তার নেতৃত্বে ২০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ মাদক উদ্ধার এবং কারবারিদের আটক করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   খুলনা  আইনশৃঙ্খলার অবনতি  খুন  সহিংসতা  মাদক  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: