ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সংগৃহীত ছবি ইসরায়েলে সরকার পরিবর্তন হলেই কি অধিকৃত পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কমবে? অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও জমি দখল এবং চলাচলে বিধিনিষেধের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়নের শিকার লাখো ফিলিস্তিনির মনে এখন এই প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে পশ্চিমতীরের পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। তবে ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে তাদের কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিংবা পশ্চিমতীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অবসানের সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিনিদের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
২৮ অক্টোবর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা সম্পর্কে নেতানিয়াহু আগে থেকে কতটা জানতেন, তা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ বেড়েছে। তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ইয়াশার, ডেমোক্র্যাটস, ইসরায়েল বেইতেনু ও টুগেদার অ্যালায়েন্স— এই চার দল একজোট হয়েছে। তবে নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার আভাস মেলেনি। ফলে সরকার গঠনে জোটের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক কূটনীতিক বেন এফ্রাইমের মতে, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন সাময়িক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, সরকার বদলালে পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বড় কোনো পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
দ্য নিউ আরবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বাস করেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ। বসতি স্থাপনকারীরা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ৭ থেকে ৮ শতাংশ হলেও দেশটির রাজনীতিতে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। নেতানিয়াহুর সরকারে কট্টর ডানপন্থিদের অংশগ্রহণের পর আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পশ্চিমতীরে বসতি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শায়েল বেন এফ্রাইম দ্য নিউ আরবকে বলেন, বসতি স্থাপনকারীদের চাপের মুখে ইসরায়েলের বামপন্থিরাও কখনো কখনো ডানপন্থিদের তুলনায় বেশি বসতি সম্প্রসারণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার মতে, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেও পশ্চিমতীরে নতুন বসতি নির্মাণ অব্যাহত থাকতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পশ্চিমতীরে প্রতিদিন গড়ে ছয়টি হামলা চালিয়েছেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনিদের প্রধান কৃষিপণ্য জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে কৃষকদের ওপর এসব হামলা আরও বেড়ে যায়।
গত সপ্তাহে আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৩ অক্টোবর ইসরায়েলের একটি চেকপোস্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর গুলির ঘটনার পর দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। এরপর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হামলাকারীদের এলাকার বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করে। তিন দিন পর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য নিউ আরব জানায়, এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৪০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। নেতানিয়াহু ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিমতীরে সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নির্বাচনের আগে সমর্থন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকতে পারেন।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে ইয়াশার পার্টির গাদি আইজেনকোটকে। তিনি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিলেও ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে নিয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমাধানের বিরোধী। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহান্নাদ কাফেশা দ্য নিউ আরবকে বলেন, ‘ইসরায়েলে যে সরকারই আসুক, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র দেবে না।’ তার মতে, আইজেনকোট ক্ষমতায় এলে সহিংসতা কমতে পারে, কিন্তু বসতি সম্প্রসারণের নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কোনো জোটই এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধীরা আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও ইউনাইটেড আরব লিস্টের (রাম) সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনে তাদের সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। সাংবাদিক কাফেশার ধারণা, আরব দল দুটি ১৫টি আসন পেলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যে সরকারই গঠিত হোক, দখলদারিত্বের বিষয়ে ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত।
অধিকৃত পশ্চিমতীরে প্রায় ৩৪ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করেন। তারা ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। তবে ইসরায়েলের নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনিরা ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন। কাফেশার মতে, তাদের ভোটের মাধ্যমে পশ্চিমতীরের মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কিছুটা কমানোর আশা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নরকে বাস করছি। আমরা শুধু একটু স্বস্তিতে শ্বাস নিতে চাই।’
নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে পশ্চিমা দেশগুলো নতুন সরকারের মাধ্যমে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে। এতে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার আশঙ্কাও করছেন ফিলিস্তিনিদের একাংশ।
বেথলেহেমের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের পরিচালক মাজিন কুমসিয়েহ দ্য নিউ আরবকে বলেন, আসন্ন নির্বাচনটি ফ্যাসিস্ট ও চরম ফ্যাসিস্টদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তার মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে কাফেশার কাছে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে ফিলিস্তিনিদের বাস্তব জীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরে ইসরায়েল গাজায় এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের জন্য কী করেছে? আমাদের জীবনে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?’
সময়ের আলো/ইউএমএইচ