তাওহীদ হৃদয় ও সাদমান ইসলাম । ছবি : সংগৃহীতশতকের এত কাছে এসেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে! ২১৯ বলের ধৈর্যের পরীক্ষা, নতুন বলের বিপক্ষে লড়াই, সতীর্থদের আসা-যাওয়া— সব সামলে দিনের শেষ বিকালে যখন আর মাত্র এক রান দূরে দাঁড়িয়ে সাদমান ইসলাম, তখনই প্রকৃতির বাধা। আলোস্বল্পতায় থেমে গেল খেলা। অপূর্ণ রয়ে গেল সেঞ্চুরির গল্প। মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের এই ওপেনার অপরাজিত ৯৯ রানে। তার ব্যাটে ভর করেই প্রথম দিনের কঠিন পরীক্ষায় লড়াই করার মতো পুঁজি পেয়েছে বাংলাদেশ।
সাদমানের ইনিংসটা কেবল একটি সম্ভাব্য সেঞ্চুরির গল্প নয়; এটি ধৈর্য, দায়িত্ব আর পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার গল্প। যেখানে শুরুতে রান তোলাই ছিল কঠিন, সেখানে উইকেট আঁকড়ে থেকে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। কখনো পেসারদের বাড়তি বাউন্স সামলেছেন, কখনো স্পিনারদের ঘূর্ণি বুঝে খেলেছেন। আবার সুযোগ পেলে তুলে নিয়েছেন দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারিও। দিনের শেষে তার নামের পাশে ৯৯ রান, ১০টি চার। কিন্তু স্কোরকার্ডের এই সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অপূর্ণতার অপেক্ষা।
দিনের শুরুতে সাদমানের সঙ্গী তানজিদ হাসান খুব বেশি সময় টিকতে পারেননি। নতুন বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেসাররা সুইং ও বাড়তি বাউন্স আদায় করে নিচ্ছিলেন। সেই চ্যালেঞ্জে ধুঁকতে থাকা তানজিদ ২৩ বল খেলে করেন মাত্র ৭ রান। জেইডেন সিলসের বলে দ্বিতীয় সিøপে জাস্টিন গ্রিভসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। শুরুতেই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। কিন্তু সাদমান ছিলেন নিজের ছন্দে। তাড়াহুড়ো নয়, বরং বলের গুণাগুণ বুঝে খেলার দিকেই মনোযোগ ছিল তার। শর্ট বলগুলো সামলেছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, অফ স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়েছেন সতর্কভাবে। মুমিনুল হকের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে ৫৯ রানের জুটি গড়ে দলকে কিছুটা স্বস্তি দেন। লাঞ্চের আগে মুমিনুল ২৮ রান করে ফিরলেও সাদমান টিকে থাকেন। প্রথম সেশন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৯৬ রান।
লাঞ্চের পর নিজের অর্ধশতক পূর্ণ করেন সাদমান। তবে আনন্দের সেই মুহূর্তের পরপরই আবার ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। জোমেল ওয়ারিকানের বলে প্যাডল সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। রস্টন চেজের সফল রিভিউয়ে বিদায় নিতে হয় তাকে। ৪২ বলে ১৯ রান করে শান্ত যখন ফেরেন, বাংলাদেশের স্কোর ১১২, উইকেট তিনটি। সেখান থেকে ইনিংসের হাল ধরেন সাদমান ও তাওহীদ হৃদয়। শুরুতে সাবধানি হৃদয় ধীরে ধীরে সাবলীল হয়ে ওঠেন। শামার জোসেফের বলে শক্তিশালী পুল শটসহ কয়েকটি বাউন্ডারি মারেন তিনি। অন্যদিকে জাস্টিন গ্রিভসের বলে কাভার ড্রাইভে নিজের সামর্থ্যরে ছাপ রাখেন সাদমান। কখনো বল পাঠিয়েছেন ফাইন লেগে, কখনো ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়েছেন সিঙ্গেলে। ঝুঁকি কমিয়ে, সময় নিয়ে ইনিংস গড়ার যে পরিকল্পনা, তাতে দুজনই ছিলেন অবিচল।
এই জুটিই দিনের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হয়ে আসে বাংলাদেশের জন্য। চা-বিরতির সময় স্কোর ৩ উইকেটে ১৭৭। সাদমান তখনও ক্রিজে, দলের ইনিংসের ভিত আরও মজবুত করার পথে।
চা-বিরতির পরও সাদমানের ব্যাটে ছিল একই ধৈর্য। তবে সুযোগ পেলে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি। রস্টন চেজের শর্ট বল মিডউইকেট দিয়ে সীমানার বাইরে পাঠান। অভিষিক্ত বাঁহাতি স্পিনার জশুয়া বিশপের বলেও খেলেন কাভার ড্রাইভ। বিশপ মাঝেমধ্যে তীক্ষè টার্নে ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা নিলেও সাদমান নিজের মনোযোগ ধরে রাখেন। তার সামনে তখন একটাই লক্ষ্য— ইনিংসটাকে যতটা সম্ভব বড় করা।
কিন্তু চতুর্থ উইকেটে ৮৮ রান যোগ করার পর হৃদয়ের লড়াই থেমে যায় চোটে। ক্র্যাম্পের কারণে ক্রমেই অস্বস্তিতে পড়ছিলেন তিনি। একসময় সিঙ্গেল নেওয়াও কঠিন হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ইনিংসের ৬৬তম ওভারে আর ব্যাটিং চালিয়ে যেতে পারেননি হৃদয়। স্ট্রেচারে করে তাকে মাঠের বাইরে নিতে হয়। ৮৪ বলে ৪২ রান করা হৃদয়কে হারালেও সাদমান তখনও অপরাজিত, বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় ভরসা। হৃদয়ের বিদায়ের পর ক্রিজে আসেন লিটন দাস। হিপের চোটের কারণে তার খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ম্যাচের আগে ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। মাঠে নেমেই ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে একটি চার মারেন লিটন। এরপরই আলোস্বল্পতায় দিনের খেলা প্রথমবার বন্ধ করেন আম্পায়াররা।
বেলা ৩টা ১৬ মিনিটে বন্ধ হওয়া খেলা প্রায় ৫০ মিনিট পর আবার শুরু হয়। তখন সাদমানের রান ৯৬। শতকের জন্য প্রয়োজন চার রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক চেজ পেসার আনার চেষ্টা করলেও আম্পায়াররা আলোকে পেস বোলিংয়ের জন্য যথেষ্ট মনে করেননি। খেলা ফেরার পর চার ওভারের মধ্যেই ৯৬ থেকে ৯৯ রানে পৌঁছে যান সাদমান। বাকি রইল মাত্র এক রান। কিন্তু সেই এক রান আর নেওয়া হলো না। বিকাল ৪টা ২২ মিনিটে আবারও আলোস্বল্পতায় বন্ধ হয়ে যায় খেলা। এরপর আর মাঠে ফেরা হয়নি ক্রিকেটারদের। ২১৯ বলের ইনিংসে ১০টি চার মেরে ৯৯ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করতে হয় সাদমানকে।
টেস্ট ক্রিকেটে দিনের খেলা শেষে ৯৯ রানে অপরাজিত থাকার ঘটনা এটি ২০তম। বাংলাদেশের হয়ে এর আগে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল কেবল মুশফিকুর রহিমের, গত বছর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। ইতিহাসের আগের ১৯টি ঘটনাতেই পরবর্তী সময়ে শতক পূর্ণ করেছিলেন ব্যাটসম্যানরা। সাদমানের সামনেও এখন সেই সুযোগ।
প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ২১৩ রান। স্কোরবোর্ডে সংখ্যাটা ভালো, কিন্তু দিনের সবচেয়ে বড় গল্পটি আটকে আছে একটি রানে। সাদমানের অপেক্ষা এখন সেই এক রানের— যে রান তাকে পূর্ণতা দিতে পারে দীর্ঘ ধৈর্যের ইনিংসে। দ্বিতীয় দিনের সকালে আলো ফিরবে, খেলা ফিরবে, ফিরবে কি সাদমানের শতকের আনন্দও? মিরপুরে এখন সবার চোখ সেই অপেক্ষায়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসকে