ভারতীয় জাম্পিং অ্যান্ট। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকমানুষের মস্তিষ্কের আকার চাইলেই ছোট বা বড় করা সম্ভব নয়। কিন্তু ভারতের পশ্চিম উপকূলের বনাঞ্চলে বসবাসকারী এক প্রজাতির পিঁপড়ার ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর ঘটনা। জীবনের একপর্যায়ে তাদের মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে যায়। আবার পরিস্থিতি বদলালে সেই মস্তিষ্কই ফিরে পায় আগের আকার। শুধু তাই নয়, মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে যায় পিঁপড়াটির প্রজননক্ষমতা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও আচরণও। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এই পিঁপড়ার মধ্যে এমন এক ধরনের মস্তিষ্কের নমনীয়তা শনাক্ত করেছেন, যা কীটপতঙ্গের ক্ষেত্রে আগে দেখা যায়নি। খবর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের।
পিঁপড়ার সাধারণ কলোনিতে একটি রানীই ডিম পাড়ার দায়িত্ব পালন করে। অন্য সদস্যরা শ্রমিক হিসেবে খাবার সংগ্রহ, বাসার যত্ন নেওয়া, বাচ্চা লালন-পালন ও শত্রুর মোকাবিলার কাজ করে। কিন্তু ভারতীয় জাম্পিং অ্যান্টের সমাজে নিয়ম কিছুটা ভিন্ন। এই প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম হারপেগনাথোস সল্টেটর। বড় কালো চোখ ও চিমটার মতো চোয়ালের এই পিঁপড়ার প্রতিটি সদস্যেরই প্রজননের সক্ষমতা রয়েছে। তবে সেই সুযোগ পেতে হলে জিততে হয় কঠিন প্রতিযোগিতা।
কলোনির রানী মারা গেলে শ্রমিক পিঁপড়াদের মধ্যে শুরু হয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। তারা একে অন্যকে অ্যান্টেনা দিয়ে দ্রুত খোঁচা মেরে শক্তি ও কর্তৃত্ব প্রদর্শন করে। অনেকটা ক্ষুদ্র দ্বন্দ্বযুদ্ধের মতো এই প্রতিযোগিতায় কলোনির প্রায় অর্ধেক সদস্যও অংশ নিতে পারে। লড়াই কখনো কখনও ৪০ দিন পর্যন্ত চলে। শেষ পর্যন্ত একজন বিজয়ী হয়। সে-ই পায় প্রজননের অধিকার। গবেষকরা এই প্রজননক্ষম শ্রমিককে বলেন ‘গ্যামারগেট’। গ্রিক শব্দ থেকে আসা নামটির অর্থ ‘বিবাহিত শ্রমিক’।
বিজয়ী হওয়ার পর পিঁপড়াটির শরীরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। তার ডিম্বাশয় বড় হয়ে ওঠে এবং সে ডিম উৎপাদনে সক্ষম হয়। কিন্তু একই সময়ে তার মস্তিষ্কের আয়তন প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়। গবেষকদের কাছে বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মস্তিষ্কের এতটা অংশের আয়তন কমে যাওয়ার পরও পিঁপড়াটি নতুন দায়িত্ব পালনে সক্ষম থাকে। তার আচরণও বদলে যায়। গ্যামারগেট অবস্থায় সে বিষ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, শিকার করা ছেড়ে দেয় এবং বাইরের অনুপ্রবেশকারীদের এড়িয়ে আড়ালে থাকার চেষ্টা করে।
তবে মস্তিষ্কের এই সংকোচন স্থায়ী নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেনেসো স্টেট ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিদ্যা, বিবর্তন ও জীববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ক্লিন্ট পেনিকের নেতৃত্বে একদল গবেষক বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখে। তারা জানতে চেয়েছিলেন, প্রজননক্ষম অবস্থায় মস্তিষ্কের যে আয়তন কমে যায়, তা আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারে কি না।
এ জন্য গবেষকরা ৬০টি গ্যামারগেটকে আলাদা রং দিয়ে চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে ৩০টিকে কয়েক সপ্তাহের জন্য কলোনি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। বাকি ৩০টি পিঁপড়াকে রাখা হয় নিয়ন্ত্রণ দলে। বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে গ্যামারগেটগুলোর প্রজননক্ষমতা কিছুটা কমে আসে। পরে তাদের আবার মূল কলোনিতে ফিরিয়ে দেওয়া হলে অন্য শ্রমিকরা তাদের ধরে আটকে রাখে।
পিঁপড়াদের এই আচরণকে গবেষকরা বলেন ‘পুলিশিং’। কলোনিতে প্রজননক্ষম সদস্যের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শ্রমিকরা এমন ব্যবস্থা নেয় বলে ধারণা করা হয়। কোনো গ্যামারগেটের ডিম্বাশয় আংশিকভাবে সংকুচিত হয়ে এলে অন্য শ্রমিকরা তাকে কামড়ে ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত আটকে রাখতে পারে। তবে সাধারণত এতে তার শরীরে গুরুতর ক্ষতি হয় না। গবেষক পেনিক বিষয়টিকে পিঁপড়াদের ‘জেলে’ আটকে রাখার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এরপরই দেখা যায় সবচেয়ে চমকপ্রদ পরিবর্তন। গবেষকরা পিঁপড়াগুলোর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখতে পান, গ্যামারগেটগুলো আবার শ্রমিকের বৈশিষ্ট্যে ফিরে এসেছে। তাদের ডিম্বাশয় ছোট হয়ে গেছে, বিষ উৎপাদন আবার শুরু হয়েছে এবং মস্তিষ্কের আয়তনও আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। অর্থাৎ প্রজননক্ষম হওয়ার সময় যে মস্তিষ্ক সংকুচিত হয়েছিল, শ্রমিকের ভূমিকায় ফিরে আসার পর সেটি আবার আগের আকার ধারণ করেছে।
গবেষকদের ধারণা, অন্য শ্রমিকদের হাতে আটকে পড়ার সময় তৈরি হওয়া চাপ পিঁপড়ার শরীরে ধারাবাহিক রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। এর মধ্য দিয়ে গ্যামারগেট আবার শ্রমিকের অবস্থায় ফিরে যায়। ক্লিন্ট পেনিকের মতে, প্রাণিজগতে এমন মাত্রার পরিবর্তন এবং বিশেষ করে সেই পরিবর্তন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা বেশ বিরল।
অবশ্য প্রাণীদের মস্তিষ্কের আকার ও গঠনে পরিবর্তনের কিছু নজির আগে থেকেই রয়েছে। শীতনিদ্রায় থাকা স্থল— কাঠবিড়ালির মস্তিষ্কে পরিবর্তন দেখা যায়। আবার প্রজনন মৌসুমে সাদা-মুকুট চড়ুই নতুন ডাক শেখার জন্য বিপুলসংখ্যক নিউরন তৈরি করে। শীত এলে সেই নিউরনের অনেকগুলো আবার কমে যায়। কিন্তু একটি কীটপতঙ্গের মস্তিষ্কের আয়তন এতটা কমে গিয়ে পরে সম্পূর্ণ আগের অবস্থায় ফিরে আসার ঘটনা আগে জানা ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী এমিলি স্নেল-রুডের মতে, অনেক সামাজিক কীটপতঙ্গের জীবনযাত্রা ও দায়িত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে পরিবর্তন ঘটে।
তবে একবার পরিবর্তিত হয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক র্যাচেল অ্যাডামস মনে করেন, আরও প্রাণীর মধ্যে এমন ক্ষমতা থাকতে পারে, যা এখনও গবেষকদের নজরে আসেনি।
সময়ের আলো/ প্রিন্ট/কেএইচও