সংগৃহীত ছবি দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডের অধীনে প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে কুড়িগ্রাম জেলার শিক্ষাব্যবস্থায় বড়ো ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জেলার ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি, যা বোর্ডের অধীন জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন ৮টি জেলার মোট ৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়। কুড়িগ্রামের এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৭০ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও একজনও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এর মধ্যে শুধু রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজ থেকেই ২৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন।
চলতি বছর কুড়িগ্রাম জেলা থেকে মোট ১১ হাজার ৭২২ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন মাত্র ৪ হাজার ৭৭৩ জন। জেলায় গড় পাসের হার ৪০.৭২ শতাংশ (বোর্ডে গড় পাসের হার ৪৫.৯৮ শতাংশ)। জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ১৩৬ জন শিক্ষার্থী।
পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কুড়িগ্রামে ৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। আমরা অনুসন্ধান করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো
বোর্ডের ফলাফল অনুযায়ী, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী আদর্শ মহিলা কলেজ (২৪ জন), রাজারহাট উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীহাট কলেজ (১০ জন), একই উপজেলার সিঙ্গার ডাবরীর হাট বি. এল. হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ (৬ জন) এবং পাঙ্গারানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১ জন)।
নাগেশ্বরী উপজেলার নাগেশ্বরী মডেল কলেজে ১৫ জন, কুটি পেয়ারাডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫ জন এবং চিলাখানা মডেল কলেজে ৪ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ফেল করেছে। এ ছাড়া উলিপুর উপজেলার হজরত ফাতিমা (রা.) পৌর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩ জন এবং চিলমারী উপজেলার দক্ষিণ খাওরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২ জন পরীক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি।
ফলাফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে
সরেজমিনে জানা যায়, উলিপুরের হজরত ফাতেমা (রা.) পৌর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হাফিজ রহুল আমিন জানান, তার প্রতিষ্ঠানের তিন পরীক্ষার্থীই বিবাহিত। সংসারের চাপের কারণে তারা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারেনি।
সিঙ্গার ডাবড়ীহাট কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তৌহিদুল ইসলাম জানান, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি গত বছর পর্যন্ত ভালো করলেও সরকার এখনো এমপিওভুক্ত করেনি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীরা হতাশ। প্রশ্ন কঠিন হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ভালো না থাকায় এ বিপর্যয় ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলেজটির কার্যক্রম গত তিন বছর ধরে ভাড়াবাড়িতে চলছে। ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি বা কোনো ক্লাসই হয় না। একই অবস্থা রাজারহাটের পাঙ্গারানী লক্ষ্মীপ্রিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজেরও; কলেজ শাখা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সব শিক্ষক চলে গেছেন, ফলে ক্লাস ও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীন আট জেলার মধ্যে পাসের হারে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ নিয়ে কুড়িগ্রামের অবস্থান ষষ্ঠ। চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সংকট এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা ।
সময়ের আলো/এনএন