জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ছবি : সংগৃহীতদেশে স্টার্টআপের বিকাশ এবং উদ্যোক্তাদের কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা সুবিধা নিশ্চিতে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স’ নিবন্ধন ও কর পরিপালনের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সংস্থাটি। নিবন্ধনের আবেদন পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষ করে সনদ দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানের সই করা এক নির্দেশনায় এ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সূত্রমতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের বিধানটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এ সুবিধা পেতে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছু শর্তও পূরণ করতে হবে। শুধু নিবন্ধনের আবেদন করলেই চলবে না, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, মালিকানা ও হিসাবব্যবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থায় আয়কর কর্তৃপক্ষকে শুধু পড়ার উপযোগী বা ‘রিড অনলি’ প্রবেশাধিকার দেওয়ার সম্মতিও জমা দিতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে যেসব নথি লাগবে
নির্দেশনা অনুযায়ী, স্টার্টআপ স্যান্ডবক্সের সুবিধা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এনবিআরে নিবন্ধিত হতে হবে। এ জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে এনবিআরের সদস্য (কর আপিল ও অব্যাহতি) বরাবর আবেদন করতে হবে।
আবেদনের সঙ্গে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে পাওয়া ইনকরপোরেশন সার্টিফিকেট ও সংঘস্মারক (এমওএ) জমা দিতে হবে। পাশাপাশি স্টার্টআপের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণও দিতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি), অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার, মূল ডিজিটাল সিস্টেম অথবা হিসাবের খতিয়ানে আয়কর কর্তৃপক্ষকে পাঠযোগ্য বা ‘রিড অনলি’ প্রবেশাধিকার দেওয়ার সম্মতিপত্র জমা দিতে হবে।
৬০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত না এলে অনুমোদন
নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিবন্ধনের আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা। এনবিআর আবেদন পাওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স নিবন্ধন সনদ’ ইস্যু করবে। কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এনবিআর সিদ্ধান্ত না দিলে আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
এ বিধান কার্যকর হলে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রতা কমার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ এত দিন আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় উদ্যোক্তাদের থাকতে হতো। নতুন নির্দেশনায় সেই অপেক্ষার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে সনদ ইস্যু, নিবন্ধনের কার্যকর তারিখ এবং সুবিধা গ্রহণের প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হিসাবব্যবস্থায় কর কর্তৃপক্ষের প্রবেশাধিকার
নতুন নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্টার্টআপের ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থায় আয়কর কর্তৃপক্ষের প্রবেশাধিকার। প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ইআরপি, অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার, মূল ডিজিটাল সিস্টেম অথবা হিসাবের খতিয়ানে কর কর্তৃপক্ষকে ‘রিড অনলি’ প্রবেশাধিকার দেওয়ার সম্মতিপত্র জমা দিতে হবে।
রিড অনলি প্রবেশাধিকার বলতে সাধারণত কোনো তথ্য দেখা ও পর্যালোচনা করার সুযোগ বোঝায়, কিন্তু তথ্য পরিবর্তন বা মুছে ফেলার অনুমতি বোঝায় না। ফলে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে।
একদিকে এতে কর পরিপালন নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের গোপনীয়তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ব্যবসায়িক গোপন তথ্য, গ্রাহকের তথ্য এবং প্রযুক্তিগত সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে।
নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতাও থাকছে
নির্দেশনায় নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করা হয়েছে। উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট স্টার্টআপকে যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ দিয়ে এনবিআর নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। ভুল তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে অথবা আয়কর কর্তৃপক্ষকে ডিজিটাল সিস্টেমে প্রবেশাধিকার দিতে বাধা সৃষ্টি করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। নোটিসের জবাব দিতে প্রতিষ্ঠানকে ৬০ দিন সময় দেওয়া হবে।
এরপর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে শুনানির সুযোগ দিতে হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে লিখিত আদেশের মাধ্যমে নিবন্ধন বাতিল করা যাবে। অর্থাৎ নিবন্ধন পাওয়ার পরও শর্ত পালনের বাধ্যবাধকতা থাকবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ভুল তথ্য দিয়ে নিবন্ধন নিলে কিংবা কর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রবেশাধিকারে বাধা দিলে তার নিবন্ধন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ, সঙ্গে জবাবদিহি
স্টার্টআপ খাতের জন্য কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ব্যবসা শুরুর পর প্রাথমিক পর্যায়ে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা, বিনিয়োগ সংগ্রহ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় উদ্যোক্তাদের। এ অবস্থায় কর-সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ করা হলে তা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক হতে পারে।
এনবিআরের নতুন নির্দেশনায় একদিকে নিবন্ধনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, অন্যদিকে কর পরিপালনের বিষয়েও কঠোরতা রাখা হয়েছে। ফলে সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রদানের দায়বদ্ধতাও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, ৬০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন এবং নির্ধারিত সময়ে সিদ্ধান্ত না এলে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের বিধান স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থায় কর কর্তৃপক্ষের প্রবেশাধিকারের শর্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সময়ের আলো/কেএইচও