প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম
মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের ম্যাচের দৃশ্য । ছবি : সংগৃহীতমিরপুরে জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে ফিরতে পারল না বাংলাদেশ। বোলাররা প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আটকে দিয়েছিল, দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন নাঈম হাসানও। কিন্তু ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ক্যারিবীয় ব্যাটারদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি স্বাগতিকরা। ব্র্যান্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেলের ১১২ রানের উদ্বোধনী জুটিতেই কার্যত শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের সব আশা। অধিনায়ক রোস্টন চেজের পাঁচ উইকেটের পর ব্র্যান্ডন কিংয়ের অপরাজিত ৮১ রানের ইনিংসে এক দিন হাতে রেখেই ৮ উইকেটের জয় তুলে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দুই টেস্টের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার পথও কঠিন করে দিল তারা।
এই হারে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের পাশাপাশি ফাইনালে ওঠার সমীকরণেও বড় ধাক্কা লাগল। ফাইনালে খেলার আশা বাঁচিয়ে রাখতে বাকি পাঁচ টেস্টের অন্তত চারটিতে জিততে হবে বাংলাদেশকে। অন্য ম্যাচটি ড্র করতে হবে। অর্থাৎ শেষ পাঁচ ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তৃতীয় দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে ধুঁকছিল বাংলাদেশ। লিড ছিল মাত্র ১০৬ রানের। চতুর্থ দিনের সকালে জাকের আলি ও নাঈম হাসানের ব্যাটে সেই লিড বাড়ানোর আশা ছিল স্বাগতিকদের। আগের দিন শেষ বিকালে বিপদ সামলে দারুণ একটা জুটি গড়েছিলেন দুজনে। কিন্তু নতুন দিনের শুরুতেই সেই জুটি ভেঙে দেন জোমেল ওয়ারিকান। মাত্র পাঁচ বলের মধ্যে জাকেরের ব্যাটের কানায় লেগে আসা বল সিøপে তালুবন্দি করেন অধিনায়ক রস্টন চেজ।
এরপর নিজের বোলিংয়ে হাসান মাহমুদের ক্যাচ ফেলে দেন ওয়ারিক্যান। কিছুক্ষণ পর তার বলেই নাঈমের ক্যাচ ছাড়েন চেজ। তখন ২৯ রানে ব্যাট করছিলেন নাঈম। পাওয়া জীবন কাজে লাগিয়ে এক প্রান্ত আগলে রাখেন এই অফ স্পিনার। আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা না করে ধৈর্যের সঙ্গে রান বাড়াতে থাকেন তিনি। তবে অন্য প্রান্তে বাংলাদেশের শেষ উইকেটগুলো তুলে নিতে খুব বেশি সময় নেয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওয়ারিকান ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদকে। এরপর তাইজুল ইসলামের ব্যাটের কানায় লেগে আসা বল ধরে টেস্ট ক্যারিয়ারের ১০০তম উইকেট পূর্ণ করেন চেজ। বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ১৬৯ রানে।
বৃষ্টি থামার পর খেলা শুরু হলে নিজের প্রথম টেস্ট ফিফটি পূর্ণ করেন নাঈম। কিন্তু পরের ওভারেই চেজকে আক্রমণ করতে গিয়ে উইকেট হারান তিনি। ৫২ রানে থামে তার লড়াই। তাতে ১৪২ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৭০ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের লিড সীমিত রাখেন চেজ। লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রথম ওভারেই চাপ তৈরির চেষ্টা করে বাংলাদেশ। লেগ বিফোরের আবেদনে দুবার রিভিউও নেয় স্বাগতিকরা। তবে জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিং সেই চাপ সামলে নেন। এরপর আর ক্যারিবীয়দের সামনে কার্যকর কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের বোলিং।
বিশেষ করে ক্যাম্পবেল ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। মেহেদী হাসান মিরাজের এক ওভারে তিন বলের মধ্যে একটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকিয়ে দলের রান বাড়িয়ে নেন তিনি। দুই ওপেনারের দৃঢ়তায় সহজ হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের পথ। বৃষ্টির কারণে দ্বিতীয় দফায় খেলা বন্ধ হওয়ার সময় ১৪ ওভারে বিনা উইকেটে ৬৩ রান তুলে ফেলেছিল সফরকারীরা। বিরতির পরও একই ধারায় এগোতে থাকেন কিং ও ক্যাম্পবেল। নিয়মিত বাউন্ডারি হাঁকিয়ে বাংলাদেশের বোলারদের চাপে রাখেন তারা। দূরে বজ্রপাতের কারণে আম্পায়াররা একবার খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরে পাঠালেও উদ্বোধনী জুটি ভাঙেনি। টানা তিনটি চার মেরে অর্ধশতক পূর্ণ করেন কিং। এর মধ্যে দ্বিতীয় চারের সময় দ্বিতীয় স্লিপে তার ক্যাচ ফেলে দেন শান্ত। সেই ক্যাচ ধরতে গিয়ে আঘাত পান টাইগার অধিনায়ক। আঙ্গুলের ব্যথা নিয়ে মাঠ ছাড়লেও পরে আবার মাঠে ফিরেন।
শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পবেলকে ফিরিয়ে কিছুটা স্বস্তি ফেরান শরিফুল ইসলাম। ভেতরের দিকে ঢুকে আসা বলে ব্যাটের ভেতরের কানায় বোল্ড হন ক্যাম্পবেল। ফিফটি থেকে মাত্র এক রান দূরে থামে তার ইনিংস। ১১২ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙলেও ততক্ষণে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত গড়ে ফেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরপর ধীরগতির তেগনারাইন চান্দারপলকে নিয়ে এগোতে থাকেন কিং। চান্দারপলকে ফিরিয়ে বাংলাদেশ আরেকবার ক্ষণিকের জন্য ম্যাচে ফেরার আশা দেখেছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও বেশিক্ষণ টেকেনি। ৭০ রানে থাকার সময় কিংয়ের আরেকটি ক্যাচ ছাড়ে বাংলাদেশ। অন্য প্রান্তে কাভেম হজ দ্রুত রান তুলতে থাকায় জয়ের পথে আর কোনো বাধাই আসেনি সফরকারীদের।
শেষ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ রান রেটে ১৭০ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৪৯ রানে অপরাজিত থাকা কিং দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। এক দিন হাতে রেখেই ৮ উইকেটের এই জয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ক্যারিবীয়রা।
সিরিজের আগের দিন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনা হলেও মিরপুরে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা আবারও বড় হয়ে দেখা দিল। বোলাররা লড়াই করে ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি করলেও দুই ইনিংসেই ব্যাটারদের ব্যর্থতায় সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। সিরিজে সমতা ফেরাতে এখন সিলেটের দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোই লক্ষ্য বাংলাদেশের। তবে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে সামনে যে কঠিন হিসাব অপেক্ষা করছে, এই হার সেটি আরও স্পষ্ট করে দিল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই