গাইবন্ধা জেরা প্রশাসক কার্যালয়। ছবি : সময়ের আলোএকটি জমি একবার সরকারের হয়ে গেলে কাগজেও সরকারের নামে ওঠার কথা। কিন্তু গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের জমি অধিগ্রহণে এর উল্টো ছবি দেখা যাচ্ছে। ১৯৫৭-৫৮ সালে অধিগ্রহণ করা জমির একটি অংশ রেকর্ডে সরকারি সংস্থার নামে ওঠেনি। ফলে মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পে ওই দাগের জমির ক্ষতিপূরণ আবার দেওয়া হয়েছে পুরোনো মালিকের পরিবারের একজনকে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নাম মুনছুর আলী। প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩২ টাকা। ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পলাশবাড়ী উপজেলার নুনিয়াগাড়ী মৌজার রাব্বীর মোড় এলাকায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৩১ নম্বর দাগের সাড়ে ১০ শতক জমি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। এর ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলে নেন মুনছুর আলী। অভিযোগকারীদের দাবি, এই দাগের একটি অংশ ১৯৫৭-৫৮ সালেই অধিগ্রহণ হয়ে গিয়েছিল। তাহলে একই জমির জন্য আবার অর্থ পরিশোধের যুক্তি কী, প্রশ্নটি সেখান থেকেই উঠেছে।
বিষয়টি সামনে আনেন স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী রেজাউল করিম। তার অভিযোগ, তার মা রেখা বেগমসহ কয়েকজন ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল ২৪৫৩ নম্বর দলিলে আট শতক জমি কেনেন। এর একটি অংশ মহাসড়কের অধিগ্রহণ-সীমার মধ্যে পড়লেও তারা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি। আপত্তি জানানোর পর মাত্র দশমিক ৪০ শতক জমির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ হয়, যা তার মতে প্রাপ্যের তুলনায় অনেক কম। নিজের ক্ষতিপূরণের হিসাব মেলাতে গিয়ে জমির পুরোনো নথি ঘাঁটতে থাকেন তিনি। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে ১৯৫৭-৫৮ সালের অধিগ্রহণের তথ্য।
রেজাউল করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১/৬৯/১৯৫৭/৫৮ নম্বর এলএ মামলায় তখন ৩২ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৮৩১ দাগ থেকে ২০ শতক এবং ৮৪২ দাগ থেকে ১২ শতক নেওয়া হয়। জমির মালিক ছিলেন মুনছুর আলীর বাবা মোফাজ্জল হোসেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, অধিগ্রহণের পরও ১৯৬২ সালের জরিপে ওই জমিসহ মোফাজ্জল হোসেনের নামেই রেকর্ড হয়। এ জায়গাতেই নথির প্রথম ভুলটি ধরা পড়ে। পরে তিনি স্ত্রী ও মেয়েদের ৫২ শতক জমি দান করেন এবং দুই ছেলে মোকছেদ ও মুনছুর আলীকে ৭০ শতক জমি দলিল করে দেন।
রেজাউল করিমের হিসাবে মূল জমির পরিমাণ ছিল ১ একর ২৭ শতক। এর মধ্য থেকে ৩২ শতক অধিগ্রহণ এবং ৫২ শতক দান বাদ দিলে মোফাজ্জল হোসেনের হাতে অবশিষ্ট থাকার কথা ৪৩ শতক, অর্থাৎ দুই ছেলের প্রত্যেকের প্রাপ্য ২১ দশমিক ৫০ শতক। তার দাবি, মুনছুর আলী নিজের অংশ থেকে ১৬ শতক বিক্রি করেছেন এবং প্রায় ছয় শতকে বাড়ি করে বসবাস করছেন। সেই হিসাবে নতুন করে সাড়ে ১০ শতক জমির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা নয়।
গোলমালের কারণ কী, তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের একটি চিঠিতেও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাসেক সড়ক সংযোগ-২ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ আখতার গাইবান্ধার জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।
চিঠিতে বলা হয়, নুনিয়াগাড়ী মৌজার আরএস ২৫ খতিয়ানের ৭৯ ও ৮০ দাগের মোট ১ একর ২৭ শতক জমির মধ্যে ১৯৫৭-৫৮ সালের এলএ মামলায় ৩২ শতক অধিগ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর। পরে বিআরএস জরিপে ৭৯ দাগটি ৮৩১ এবং ৮০ দাগটি ৮৪২ দাগে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু আগে অধিগ্রহণ করা জমি সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের নামে বিআরএস রেকর্ডে ওঠেনি। এ কারণেই ৮৩১ দাগের ক্ষতিপূরণ স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল।
অভিযোগ, এই অনুরোধের পরও মুনছুর আলীকে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩২ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। রাজস্ব শাখার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আল মামুনসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানান, বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ১৯৫৭-৫৮ সালে জমি অধিগ্রহণের পর গেজেটের মাধ্যমে তা প্রত্যাশী সংস্থার নামে রেকর্ড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় ভুলক্রমে অন্যদের নামে জমি রেকর্ড হয়েছে এবং পরে তারাই ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলেছেন। তিনি ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করে বলেন, এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রত্যাশী সংস্থার আপত্তির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। তিনি সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা জানার কথা জানান। তার ভাষ্য, কেউ ভুল তথ্য দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ তুলে নিলে তা ফেরত নিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মুনছুর আলী মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং সরাসরি কথা বলতেও রাজি হননি। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, জমিটি তিনি বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন এবং সরকারের কাছে তিনি আরও জমি পাবেন। তার অভিযোগ, একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করছে।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে গোবিন্দগঞ্জ থেকে সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাট পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এত দীর্ঘ পথের একটি দাগেই যদি পুরোনো অধিগ্রহণের রেকর্ড মেলাতে ব্যর্থতা ধরা পড়ে, তবে বাকি দাগগুলোর ক্ষেত্রে যাচাই কতটা হয়েছে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে।
ক্ষতিপূরণের অর্থ কীভাবে এবং কার অনুমোদনে ছাড় হলো, প্রকল্প ব্যবস্থাপকের আপত্তি কেন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, আর অর্থ ফেরত আনতে আইনগত পদক্ষেপ কবে নেওয়া হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। জেলা প্রশাসকের নথি পর্যালোচনার ফলাফলের অপেক্ষায় আছেন অভিযোগকারীরা।
সময়ের আলো/জোই