পাউবোর কলোনি। ছবি : সময়ের আলো গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলোনিতে বৃষ্টি নামলে ঘরের মেঝে ভিজে যায়। ভাঙা টিনের চালের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় আকাশ। শ্যাওলা ধরা পুরোনো দেয়াল থেকে মাঝেমধ্যে খসে পড়ে পলেস্তারা। অথচ সরকারি খাতাপত্রে এই কলোনির মেরামত ও সংস্কারে চার অর্থবছরে খরচ দেখানো হয়েছে এক কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি। সেই উন্নয়ন কোথাও চোখে পড়ে না।
কাজগুলো কোথায় হয়েছে, কারা করেছেন, কীভাবে দরপত্র হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি দফতরের দায়িত্বশীলরা। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সরেজমিনে কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ ঘরবাড়ির অবস্থা নাজুক। টিন জরাজীর্ণ, দেয়ালে শ্যাওলার ছাপ। বাসিন্দারা জানান, বৃষ্টি এলেই ঘরের মেঝে ভিজে যায়। এমন ঝুঁকি নিয়েই সেখানে থাকছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তাদের দাবি, মেরামতের জন্য বরাদ্দ না থাকায় নিজের টাকাতেই বাসাবাড়ি সারাতে হয়। অথচ কাগজে চিত্র একেবারে উল্টো। সেখানে প্রতিটি অর্থবছরেই কলোনির মেরামত হয়েছে।
পাউবোর তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত জঙ্গল পরিষ্কার, কলোনি ও দফতর ভবন মেরামত, পানির লাইনসহ নানা সংস্কারে মোট এক কোটি ৫৩ লাখ ১৪ হাজার টাকার বিল-ভাউচার করে অর্থ তোলা হয়েছে।
হিসাব ঘেঁটে দেখা যায়, ‘কোয়ার্টার মেরামত’ নামে একই ধরনের কাজ প্রতিটি অর্থবছরে দেখানো হয়েছে, আর প্রতিবারই অঙ্ক বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাতে খরচ দেখানো হয় চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। পরের বছর তা বেড়ে হয় ১০ লাখ, এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ লাখ এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ চার বছরে একই নামের কাজে খরচ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ।
এর বাইরেও আলাদা খাতে বড় অঙ্কের বিল তোলা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরেই আরও ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেয়ালে রংসহ দফতর মেরামতের নামে উত্তোলন করা হয় ২০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেইনকার্ট মেরামত ও স্যানিটারি মালামাল স্থাপনের জন্য ২১ লাখ ৭৬ হাজার টাকার বিল হয়। একই অর্থবছরে একই কাজ দেখিয়ে আবারও রেইনকার্ট মেরামত, ভূ-সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও কোয়ার্টারের স্থাপনা মেরামতের নামে তোলা হয় ৩১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে এই সময়ে কোনো কাজ না করেই বিপুল অঙ্কের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব কাজ কোথায় হয়েছে, জানতে চাইলে গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম তা দেখাতে পারেননি। কোথায় কী কাজ হয়েছে, সরেজমিন দেখতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। কোন কোন ঠিকাদার কাজ করেছেন, সেই তথ্যও জানাতে রাজি হননি।
দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও কোনো তথ্য মেলেনি। কোন কোন পত্রিকায়, কবে দরপত্র আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল, কোন ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে, এসবের কোনো জবাব তার কাছে পাওয়া যায়নি।
শরিফুল ইসলাম গাইবান্ধায় নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে আছেন ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে। তার আগে এই পদে ছিলেন হাফিজুল হক, যিনি বর্তমানে রংপুরে প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে কর্মরত। ফলে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত তিন অর্থবছরের বিল শরিফুল ইসলামের দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ের।
এ বিষয়টি প্রকাশের পর পাউবোর মহাপরিচালক রুহুল আমিনের নির্দেশে সম্প্রতি দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জনসংযোগ পরিদফতরের পরিচালক মো. আব্দুল মতিনকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্য রাজশাহী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী।
খাতায় দেখানো কাজগুলো বাস্তবে কোথায়, কতটুকু হয়েছে, সেটিই প্রথম প্রশ্ন। প্রতিটি অর্থবছরে একই নামে বারবার বিল তোলার যৌক্তিকতাও জানা দরকার। দরপত্র যথাযথ নিয়মে আহ্বান করা হয়েছিল কি না, কোন ঠিকাদারকে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং কাজ না হয়ে থাকলে অর্থ কোথায় গেছে ও এর দায় কার, এসব প্রশ্নই এখন তদন্ত কমিটির সামনে।
যাঁদের ঘরে বৃষ্টির পানি ঢোকে, তাদের কাছে এসব নিছক কাগজি হিসাব নয়। সরকারি অর্থ কীভাবে খরচ হচ্ছে, তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও এখানে জড়িত। তদন্ত কমিটি কত দ্রুত ও কতটা নিরপেক্ষভাবে এর উত্তর বের করে আনে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।
সময়ের আলো/জোই