কেন পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কিশোররা

সময়ের আলো ডেস্ক

শিক্ষা

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এ বছর ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের ফলাফল অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে ছেলেদের অকৃতকার্য হওয়ার হার

2026-11-02T16:36:29+00:00
2026-11-02T16:36:29+00:00
 
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
কেন পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কিশোররা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৬ পিএম 
মানবিক বিভাগে ছেলেদের অকৃতকার্য হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। সংগৃহীত ছবি
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এ বছর ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের ফলাফল অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে ছেলেদের অকৃতকার্য হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। সারা দেশে এ বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার মাত্র ৩৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে রাজশাহী বোর্ডে মানবিকের ছাত্রদের পাসের হার সর্বনিম্ন, ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ।   

চলতি বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয় মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ছাত্র ছিল ৪ লাখ ৮৩ হাজার ১৯১ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ জন। সেই হিসাবে ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি ছাত্র পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছরও ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের পাসের হার কম ছিল। ২০২৫ সালে ছাত্রদের পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, আর ছাত্রীদের ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। 

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই কিশোরদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, মাদকাসক্তি এবং কিশোর গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততার মতো বিষয়গুলোও তাদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, মানবিক বিভাগে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে কম। এ বিভাগে রাজশাহী বোর্ডে ছাত্রদের পাসের হার মাত্র ২৮ দশমিক ১১ শতাংশ। একই বোর্ডে ছাত্রীদের পাসের হার ৪৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে যশোরে ছাত্রদের পাসের হার ৩০ দশমিক ৬৫, বরিশালে ৩০ দশমিক ৯৫, চট্টগ্রামে ৩২ দশমিক ৮৯, দিনাজপুরে ৩৩ দশমিক ১৯, কুমিল্লায় ৩৩ দশমিক ৬৭, ময়মনসিংহে ৩৯ দশমিক ৩৭ এবং সিলেটে ৪১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বোর্ডে, ৪৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ। 

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী। নারী শিক্ষার প্রসারে সরকারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবার থেকেও মেয়েদের কলেজ পর্যায় পর্যন্ত তুলনামূলক বেশি নজরদারিতে রাখা হয়। এসব কারণে ছেলে শিক্ষার্থীদের চেয়ে মেয়েরা ভালো ফল করছে।

ছাত্রদের ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, করোনাকালে দেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির ক্ষেত্রে শিথিলতা ছিল। ওই সময় থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোচিংনির্ভরতা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন-সংঘাতের পরিবেশ পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগিতা তৈরি করে। এর প্রভাব ছাত্রদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়েছে। সব মিলিয়ে এইচএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব কমে যাওয়ায় অনেক ছাত্রের মধ্যে আড্ডা ও কোচিংনির্ভর হয়ে সহজে পাস করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কৈশোরের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের বেশি প্রভাবিত করায় মেয়েরা তুলনামূলক ভালো ফল করছে।

অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিভাগের ফলাফলে দেখা গেছে, বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের সাফল্য তুলনামূলক ভালো। এ বছর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার ৪৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগে এ হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। বোর্ডভিত্তিক হিসাবে বিজ্ঞানে ছাত্রদের পাসের হার সর্বোচ্চ ঢাকা বোর্ডে, ৮০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চট্টগ্রাম বোর্ডে এ হার ৭৩ দশমিক ৫৪, ময়মনসিংহে ৭৩ দশমিক ৩৯, সিলেটে ৭০ দশমিক ৬৪, যশোরে ৬৮ দশমিক ২৬, দিনাজপুরে ৬৫ দশমিক শূন্য ৯, রাজশাহীতে ৬৪ দশমিক ২৫ এবং কুমিল্লায় ৬১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের পাসের হার সবচেয়ে কম বরিশাল বোর্ডে, ৫২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

চলতি বছর মাদারীপুরের একটি বেসরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে জহিরুল ইসলাম। তার মা রেবেকা আকতার জানান, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ছেলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। রাজনীতি ও মুঠোফোন ব্যবহারেই তার বেশির ভাগ সময় কাটত। নানা চেষ্টা করেও তাকে পড়াশোনায় মনোযোগী করা সম্ভব হয়নি। বাড়িতে গৃহশিক্ষক রাখা হলেও সে নিয়মিত পড়তে বসত না। এখন ছেলেকে দেশের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

রেবেকা আকতারের মতে, শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও মুঠোফোন ব্যবহারের বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ থাকা প্রয়োজন।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. আকতার বানু মনে করেন, করোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, অনলাইন শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিতি এবং পরবর্তী সময়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস ও অটো পাসের প্রচলন তাদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া বা ওভারমার্কিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে না পড়েও ভালো ফল করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। এর ফলে তাদের অধ্যবসায় এবং গভীরভাবে পড়াশোনার আগ্রহ কমে যায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আন্দোলনও শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ছেলে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, কোচিং সেন্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের কারণে তুলনামূলক কম দক্ষ শিক্ষকদের নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টিও শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

শিক্ষার্থীদের এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. আকতার বানু। তিনি বলেন, সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুলিশের জনবল ও টহল বাড়িয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা দরকার। মাদকের সহজলভ্যতা শুধু তরুণ ও কিশোরদের নয়, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই মাদকের সরবরাহ বন্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, কয়েক বছর ধরেই ছাত্রদের ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পড়াশোনায় অমনোযোগিতা এবং অভিভাবক ও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবসহ নানা কারণে এমনটি হচ্ছে।  

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার কাজ করছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো এবং এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। 


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   পড়াশোনা 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: