বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র এস এম তোফাইল বিন হোছাইন। ছবি : সংগৃহীতপৌর এলাকার ভবন নির্মাণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল পৌর কর্তৃপক্ষের। অথচ সেই নিয়মের বেড়াজাল পাশ কাটিয়ে একক ক্ষমতাবলে ১৭৪টি ভবন ও স্থাপনার নকশা অনুমোদনের অভিযোগ উঠেছে বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র এস এম তোফাইল বিন হোছাইনের বিরুদ্ধে। নির্ধারিত ১১ সদস্যের কমিটির সুপারিশ ছাড়াই এসব নকশা অনুমোদনের ঘটনায় এবার তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।
রোববার (১ নভেম্বর) দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এ মামলাটি দায়ের করা হয়। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় দায়ের করা এ মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে সাবেক মেয়র তোফাইল বিন হোছাইনকে।
দুদকের এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত বাঁশখালী পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন তোফাইল বিন হোছাইন। এ সময়ে পৌরসভায় মোট ২৬৭টি ইমারত ও স্থাপনার নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ও ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দুটি সভায় নির্ধারিত কমিটি ৮৯টি নকশা অনুমোদন করে। কিন্তু বাকি ১৭৪টি নকশার অনুমোদন দেওয়া হয় কমিটির কোনো সুপারিশ ছাড়াই।
স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১৭ সালের ২২ জুন জারি করা পরিপত্রে পৌর এলাকায় ভবন ও স্থাপনার নকশা অনুমোদন এবং নির্মাণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে মেয়রকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে। একই পরিপত্রে প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার কমিটির সভা আয়োজনের বাধ্যবাধকতাও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সাবেক মেয়রের প্রায় আড়াই বছরের দায়িত্বকালে কমিটির সভা হয়েছে মাত্র দুটি।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত সভা আয়োজন না করে এবং নির্ধারিত কমিটির সুপারিশ ছাড়াই একক ক্ষমতাবলে ১৭৪টি ভবন ও স্থাপনার নকশা অনুমোদন দেন সাবেক মেয়র। দুদকের অভিযোগ, নিজের কিংবা অন্য কাউকে আর্থিকভাবে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি এসব অনুমোদন দিয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর বাঁশখালী পৌরসভার তৎকালীন মেয়র সেলিমুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ওই অনুসন্ধানের একপর্যায়ে সাবেক মেয়র তোফাইল বিন হোছাইনের বিরুদ্ধে কমিটির সুপারিশ ছাড়া ভবনের নকশা অনুমোদনের বিষয়টি সামনে আসে। ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ দাখিল করা আংশিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ ঘটনায় মামলা করার সুপারিশসহ পৃথক অনুসন্ধানের প্রস্তাব করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২০ মে আরও তিনটি অভিযোগ যুক্ত করে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় দুদকের প্রধান কার্যালয়। অনুসন্ধান কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর তোফাইল বিন হোছাইনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেন। পরে ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে মামলা দায়েরের অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুসন্ধান কর্মকর্তার বদলির কারণে পরবর্তী সময়ে উপসহকারী পরিচালক তাপছির বিল্লাহকে এজাহার দায়েরের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘সাবেক মেয়র তোফাইল বিন হোছাইনের বিরুদ্ধে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তকালে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সেটিও আমলে নেওয়া হবে।’
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি বাঁশখালী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তোফাইল বিন হোছাইন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ১৮ আগস্ট তার পদত্যাগ ও অপসারণের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। আন্দোলন শুরুর ১২ ঘণ্টার মাথায় ওইদিন রাতেই তাকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করা হয়। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর ৩২(ক) ধারা প্রয়োগ করে এ আদেশ জারি করা হয়েছিল।
সময়ের আলো/এনএন