আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় দেশের একমাত্র ‘বালু গবেষণা কেন্দ্র’

তৌহিদুল বকসী ঠান্ডা, কুড়িগ্রাম

সারাদেশ

৯০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি খনিজ মেগা প্রকল্প, যা থেকে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন

2026-11-02T22:26:48+00:00
2026-11-02T22:26:48+00:00
 
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
ব্রহ্মপুত্রের বালুতে বিলিয়ন ডলারের খনিজ
আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় দেশের একমাত্র ‘বালু গবেষণা কেন্দ্র’
তৌহিদুল বকসী ঠান্ডা, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম 
ব্রহ্মপুত্রের বালুতে বিলিয়ন ডলারের খনিজ। ছবি : সময়ের আলো
৯০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের একটি খনিজ মেগা প্রকল্প, যা থেকে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি)। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রাম অঞ্চলের অবহেলিত ১৫ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মোচনের মহাপরিকল্পনা। অথচ এই বিপুল সম্ভাবনাময় 'কুড়িগ্রাম বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র' প্রকল্পটি এখন আলোর মুখ দেখার আগেই ফাইলবন্দি হতে চলেছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে কেন্দ্র বা সচিবালয়ের তথ্যের চরম সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা।

ব্রহ্মপুত্রের বালু : মূল্যবান খনিজের অফুরন্ত ভাণ্ডার

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি)-এর দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় অববাহিকা থেকে কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে প্রতিবছর প্রায় এক বিলিয়ন টন নবায়নযোগ্য বালু ধেয়ে আসে। এই বালু কেবল নদীভাঙন বা বন্যার কারণ নয়, এটি আসলে মূল্যবান খনিজ সম্পদের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এখানকার বালুতে যে সমস্ত উপাদানের অস্তিত্ব গবেষণায় পেয়েছে জিএসবি তা হলো-গারনেট ও কোয়ার্টজ, ম্যাগনেটাইট, জিরকন এবং ইলমেনাইট ও রুটাইল। এসব খনিজ পদার্থ দিয়ে যা যা উৎপাদন করা যায় তা হলো-

ইলমেনাইট ও রুটাইল : বিশ্বজুড়ে টাইটানিয়াম উৎপাদনের প্রধান উৎস, যা রং, ওষুধ, প্লাস্টিক এবং ওয়েল্ডিং রডে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

জিরকন : সিরামিক শিল্প, পারমাণবিক প্রযুক্তি, আধুনিক মহাকাশযান ও উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত নিউক্লিয়ার-গ্রেড খনিজ।

ম্যাগনেটাইট : অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকধর্মী আকরিক, যা ইস্পাত কারখানা ও খনি যন্ত্রপাতিতে অপরিহার্য।

গারনেট ও কোয়ার্টজ : অলংকার শিল্প, ওয়াটার জেট কাটিং, কম্পিউটার মাইক্রোচিপ, ঘড়ি ও চিকিৎসা যন্ত্রাংশের অন্যতম কাঁচামাল।

৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ১১ জুন জিএসবির ‘মোখলেসুর রহমান মিলনায়তনে’ এই প্রকল্পের ওপর একটি নীতি-নির্ধারণী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০২৬ থেকে ২০৭৫ সাল পর্যন্ত সুদূরপ্রসারী ৫০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। লক্ষ্য— যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খনিজ-প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমির ওপর একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে মূল গবেষণা কেন্দ্রটি (মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব) স্থাপনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। এতে রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (বিরল মৃত্তিকা উপাদান) গবেষণা ছাড়াও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, স্কাডা, স্মার্ট মাইনিং এবং একটি সমৃদ্ধ 'জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার' গড়ে তোলার বৈপ্লবিক উদ্যোগ যুক্ত ছিল। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটির জমি জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন শেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

নথির মারপ্যাঁচে ‘নেতিবাচক’ কারসাজি ও বিভ্রান্তি

এতসব ইতিবাচক অগ্রগতি ও বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সভায় আকস্মিক বিপত্তি ঘটে। সভার কার্যবিবরণীর ১০ নম্বর আলোচ্য সূচিতে উল্লেখ করা হয়—“কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কর্তৃক প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না মর্মে অভিমত দেওয়া হয়েছে।”

তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে এমন কোনো নেতিবাচক বা ‘প্রকল্পবিরোধী’ প্রতিবেদন আদৌ পাঠানোই হয়নি। মূলত, গত বছরের ৫ মার্চ কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী ও রাজারহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা জমি অধিগ্রহণের যাবতীয় ইতিবাচক তথ্য-উপাত্ত ও নকশা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ফলে মন্ত্রণালয়ের নথিতে জেলা প্রশাসনের নামে এই কাল্পনিক বা বিকৃত নেতিবাচক বক্তব্য কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের বরাতে কোনো নেতিবাচক চিঠি নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে।

মুখোমুখি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জনপ্রতিনিধি : কে কী বলছেন?

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ মন্ত্রণালয়ের দাবিটি নাকচ করে দিয়ে বলেন, আমার যোগদানের আগে সাবেক জেলা প্রশাসকগণের সময় বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির সমস্ত উপাত্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গত ১৯ জুলাইয়ের সভায় জেলা প্রশাসনের যে কথিত নেতিবাচক অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আমাদের দপ্তর থেকে এই ধরনের কোনো প্রতিবেদন কখনোই পাঠানো হয়নি। এ মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জেলাবাসীর আর্থসামাজিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে।

কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বালুতে যে মূল্যবান ও বিরল খনিজ রয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা ইতোমধ্যে জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষ করে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনেক আগেই পাঠিয়েছি।

জিএসবির উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, হিমালয় থেকে আসা ব্রহ্মপুত্রের এই বালু সম্পূর্ণ পুনর্বহনযোগ্য ও নবায়নযোগ্য। আমরা যদি এই বালু থেকে হেভি ও লাইট মিনারেল (যেমন: রুটাইল, জিরকন, কোয়ার্টজ) আলাদা করতে পারি, তবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে টাইটানিয়াম ও জিরকোনিয়ামভিত্তিক বিশাল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠবে।

জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মেগা প্রকল্পটি শুরুই হলো না, অথচ মন্ত্রণালয় কীভাবে বলতে পারে লাভ হবে না ক্ষতি হবে? এটি বাস্তবায়ন হলে মঙ্গাপীড়িত কুড়িগ্রামের দারিদ্র্যের কলঙ্ক মুছে পুরো দেশের অর্থনীতি বদলে যাবে। আমরা দ্রুত এর বাস্তবায়ন চাই।

কুড়িগ্রাম হিতৈষী সংঘের সভাপতি এ কে এম সামিউল হক নান্টু বলেন, কুড়িগ্রামের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ঘটাতে হলে ব্যাপক মানুষের কর্মসংস্থান হয় এমন প্রকল্পের বিকল্প নেই। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় রিসোর্স কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে উঠতে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এই জাতীয় স্বার্থের প্রকল্পে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এক হতে হবে। অতি দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থানসহ এই অঞ্চলে অর্থনীতির চাকা ঘুরে যাবে।

শিক্ষক নেতা অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব বলেন, কুড়িগ্রাম অঞ্চলের মঙ্গা এবং বেকার সমস্যা সমাধানে সরকার দ্রুততম সময়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে এ প্রত্যাশা কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজের।

খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে যদি কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা তথ্যের বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকে, তবে আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে তা দ্রুত নিরসনের ব্যবস্থা নেব।

ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রাম। জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬ টি নদীর মধ্যে ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার এবং ব্রহ্মপুত্র নদ আন্তর্জাতিক নদী। বন্যা, খরা, শীত আর নদীভাঙ্গন এ জেলার প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশের সবচেয়ে বেশী মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে বসবাস করে কুড়িগ্রামে।

একটি অবহেলিত জেলা যখন দেশের অর্থনীতিতে বার্ষিক ১০ বিলিয়ন ডলারের জোগান দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই মন্ত্রণালয়ের টেবিলে ফাইলের ফাইল চাপা পড়ার এই সংস্কৃতি স্বাধীন ও স্বনির্ভর অর্থনীতির প্রধান অন্তরায়। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং কুড়িগ্রামের অবহেলিত ১৫ লাখ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এই মেগা প্রকল্পটি যাতে কোনো অদৃশ্য কারণে ফাইলবন্দি হয়ে না পড়ে, সেজন্য সরকারের নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ মহলের সরাসরি জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা  বালু গবেষণা কেন্দ্র  ব্রহ্মপুত্র  বালু  বিলিয়ন ডলার  খনিজ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: