প্রজ্ঞাপনেই আটকে আছে শেরেবাংলার জন্মভবন

আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি

সারাদেশ

অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের মৃত্যুর ৬৪ বছর পার হলেও এখনও তার জন্মভবন বা জন্মভিটায় কোনো

2026-11-02T23:31:48+00:00
2026-11-02T23:31:48+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
প্রজ্ঞাপনেই আটকে আছে শেরেবাংলার জন্মভবন
আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৩১ পিএম 
অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের জন্মভবন। ছবি : সময়ের আলো
অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের মৃত্যুর ৬৪ বছর পার হলেও এখনও তার জন্মভবন বা জন্মভিটায় কোনো জাদুঘর নির্মাণ হয়নি। ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া মিয়া বাড়িতে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। যা বর্তমানে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত।

তিনিই ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগের সভাপতি ও ভারতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও একসময় ছিলেন যার ব্যক্তিগত সচিব! যিনি ধারাবাহিকভাবে কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র, অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অথচ এই জাতীয় নেতার জন্মভবনটিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এ পর্যন্ত একটি গেজেট নোটিফিকেশন যুক্ত করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। তারা প্রায় ৩ শ বছরের পুরোনো এই ভবনটিকে ২০১০ সালের মার্চে প্রত্নসম্পদ হিসেবে গেজেট প্রজ্ঞাপন করলেও ভবনটিতে এখনও বসবাস করছেন হক সাহেবের নানাবাড়ির আত্মীয়রা। ভবনটিকে সংরক্ষণ ও জাদুঘর বানানোর বিষয়ে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন অধ্যাপক, গবেষক, ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনা অঞ্চল প্রধানসহ বিশিষ্টজন।

ভবনটি কেন নিজেদের অধীনে নিয়ে সংস্কার করা হচ্ছে না এমন প্রশ্ন করা হলে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর আঞ্চলিক পরিচালক (খুলনা ও বরিশাল বিভাগ) মো. মহিদুল ইসলাম জানান, শেরেবাংলার জন্মভিটার ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি যা ৫ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। এটি সংরক্ষণ করার পর সংস্কার করা হয় অনেক আগে। জন্মভবনটিতে যারা বাস করে তারা নিজেদের ভূমি বলে দাবি করে। আমরা সেটি খতিয়ে দেখছি, যদি ভূমির মালিক তারা হয় তবে সরকারের জমি অধিগ্রহণ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। চলতি অর্থবছরে ভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর আঞ্চলিক পরিচালকের উদ্যোগে সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন আছে; আশা করা হচ্ছে আগামী ডিসেম্বরে সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজ শুরু হবে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু বলেন, প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণ আইন ১৯৭৬-এর ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনো প্রত্নসম্পদের সুরক্ষার ঘোষণা করা হয়। ১২ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত হয় এর মালিকানা। একইসঙ্গে ইউনেস্কোর কতগুলো প্রস্তাবিত ধারা এই আইনে যুক্ত হওয়ায় কালচারাল হেরিটেজ ঘোষণা হওয়া মানেই এর পুরোপুরি দায়দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ও সরকারের। এ কারণে শেরেবাংলার জন্ম ভবনে কেউ মাটি খুঁড়লেও জেল-জরিমানা হবে। ভবনের কেউ কিছু পরিবর্তন করতে পারবে না। অধিদফতর কাউকে থাকার অধিকার দিলেও সেখানে কোনো কিছু পরিবর্তন করতে চাইলে আবার অনুমতি লাগবে। অধ্যাপক মান্নু আরও বলেন, শেরেবাংলার জন্মভবন এখন পৃথিবীর সবার সম্পদ। যেমনটি শেক্সপিয়ার বা কার্ল মার্ক্সের স্মৃতিময় গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান কালচারাল হেরিটেজ এর অংশ। শেরেবাংলার জন্মগ্রহণের গল্পকে কেন্দ্র করে ওখানে একটি জাদুঘর বানানো উচিত। যেখানে সারা দেশ থেকে মানুষ দেখতে যাবে। কারণ বাংলাদেশে শেরেবাংলার প্রয়োজনীয়তা কোনোদিন ফুরাবে না।

প্রসঙ্গত পৈতৃক বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখারে শেরেবাংলা জাদুঘর রয়েছে। অন্যদিকে ঝালকাঠির রাজাপুরে প্রায় ৩ শ বছরের পুরোনো জন্মভবনটি এখনও টিকে থাকলেও সংস্কার করে কোনো জাদুঘর নির্মাণ করা হয়নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন, ঝালকাঠির রাজাপুরে শেরেবাংলার জন্মভিটা ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বা নিদর্শন। যা সংরক্ষিত থাকা খুবই জরুরি। তবে সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এগুলোর দেখাশোনা করলেও বাজেট স্বল্পতা ও লোকবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। 

ইতিহাস গবেষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঝালকাঠি জেলা সেক্রটারি ইসমাঈল মুসাফির বলেন, কে বা কারা ওখানে থাকছেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাদের দ্রুত পুনর্বাসন করে হলেও শেরেবাংলার জন্মভবন রক্ষা করা জরুরি। এত গুরুত্বপূর্ণ একজন জাতীয় নেতা যাকে বাদ দিয়ে উপমহাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না অথচ তার জন্মভবন রক্ষায় সরকারের বাজেট নেই, লোকবল নেই এটা মানা যায় না। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরসহ তিনটি স্থানকে সংরক্ষণ করা হয়েছে, কবি নজরুলের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। এভাবে শেরেবাংলার ক্ষেত্রে করাও খুবই জরুরি। 

জাবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আরেকজন অধ্যাপক সুফী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই ভবনসহ জায়গা সংরক্ষণ করতেই হবে। এগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর শতভাগ ভরসা করলে হয় না। সংরক্ষণের জন্য প্রথমে এগিয়ে আসতে হয় স্থানীয় মানুষকে। তাদের সচেতন করা গেলে তারাই এগুলো বুক দিয়ে আগলে রাখেন।

জাবির প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আরেক অধ্যাপক সিকদার জুলকারনাইন বলেন, এই ভবনটির সঙ্গে সেই সময়ের রাজনীতি, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। সর্বোপরি শেরেবাংলার শৈশবের সবচেয়ে বেশি সময় এই মাতুলালয়ে কেটেছে। তাই আমাদের দাবি থাকবে, পাশের কিছু জমি অধিগ্রহণসহ ভবনটি অথবা তার পাশে দ্রুত শেরেবাংলা স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হোক।

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, শেরেবাংলা উপমহাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ নেতা। তার জন্মভবনটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর অনেক দেরিতে সংরক্ষণে এনেছে। যদিও তাতে খুব একটা কাজে আসছে না। আমরা রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আদেশ দিয়েছিলাম দুই দিনের মধ্যে সরেজমিন প্রতিবেদন দিতে। সেটি হাতে পেয়েছি— আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রস্তাব দেব— যাতে জমি অধিগ্রহণসহ একটি পরিপূর্ণ জাদুঘর বানানো যায়। এটি ঢাকা-বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এর পর্যটন সম্ভাবনাও অনেক।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশের এই মহান নেতা। সর্বোচ্চ মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকা গেট সংলগ্ন বর্তমান তিন নেতার মাজারে। সর্ব উত্তরে তিনি আর তার দক্ষিণ দিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং সর্ব দক্ষিণে খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর। 
সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   অবিভক্ত বাংলা  মুখ্যমন্ত্রী  শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক  জন্মভবন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: