ছবি : সংগৃহীতচট্টগ্রাম ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি পানি শোধনাগারে কাটছে না গ্রাহক সংকট। উৎপাদন শুরুর পর ১৯ মাস পার হয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা আটকে আছে তিন হাজারের ঘরে। অথচ ১০ হাজারের বেশি গ্রাহকের কাছে পানি সরবরাহ সক্ষমতা আছে। ৮০ শতাংশ পানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল বাণিজ্যিক গ্রাহকদের কাছে। কিন্তু পানি নিতে ছোট-বড় কোনো বাণিজ্যিক গ্রাহকই আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
গ্রাহক খরায় এখনও আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি। দৈনিক পানি উৎপাদন ক্ষমতা ৬ কোটি লিটার। গ্রাহক সংকটে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ কোটি লিটারের কিছু বেশি। এখনও দৈনিক উৎপাদন-সরবরাহ ২ কোটির ঘর ছুঁতে পারেনি। উৎপাদন ৬ কোটিতে কবে উন্নীত হবে তা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কেউই নিশ্চিত হতে পারছে না। পরিচালন ব্যয়ের কারণে আয়ের চেয়ে ভারী হচ্ছে লসের পাল্লা।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম সময়ের আলোকে বলেন, ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের পানি নেওয়ার গ্রাহক এখন কম হলেও ভবিষ্যতে বাড়বে। সার কারখানা কাফকো, ইপিজেড, চায়না ইকোনমিক জোন, ইপিজেডে সরবরাহ শুরু হলে উল্টো পানির সংকট হবে। আমাদের পরিকল্পনা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে আমরা মনে করি প্রকল্পের পানি যথাযথ ব্যবহার হবে।
বৃহৎ বাণিজ্যিক গ্রাহক সার কারখানা সিইউএফএল ভান্ডালজুড়ির পানি কেন নিচ্ছে না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, একেবারেই নিচ্ছে না তা নয়। ওই সার কারখানায় ভান্ডালজুড়ির পানি কিছু নিচ্ছে। আবার তাদের নিজস্ব উৎপাদিত পানিও ব্যবহার করছে।
ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড প্রোডাকশন) মাহবুবুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, দৈনিক পানি সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এখনও গ্রাহক মেলেনি। তাই আয়ের বিপরীতে এখনও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় বেশি হচ্ছে। গ্রাহক বাড়াতে আনোয়ারা থেকে চট্টগ্রাম নগরী পর্যন্ত একটি পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা আছে। পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগটি ইতিমধ্যে টেন্ডার পর্যায়ে আছে। এটি নির্মাণ হলে চট্টগ্রাম নগরীর গ্রাহকরাও ভান্ডালজুড়ির পানি পাবে। অন্তত গ্রাহক সংকট আর হবে না।
ওয়াসা সূত্র জানায়, ভান্ডালজুড়ি শোধনাগার থেকে দৈনিক ৬ কোটি লিটার পানি পরিশোধনের সক্ষমতা আছে। ৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে শিল্প, আবাসিক সব মিলে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার গ্রাহক দরকার হবে। ৮০ শতাংশ গ্রাহক বাণিজ্যিক হবে- এই টার্গেটে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের সাড়া মেলেনি। আবাসিক গ্রাহকও অনেক কম। মাত্র তিন হাজার আবাসিক গ্রাহক পানি নিচ্ছে। বেশিরভাগ পটিয়া পৌর এলাকায়।
বোয়ালখালী এলাকায় পানি নিচ্ছে খুব কমসংখ্যক গ্রাহক। মাত্র তিনশ গ্রাহক আছে পৌর এলাকায়। বৃহৎ গ্রাহক কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (সিইউএফএল) পানি নিচ্ছে না। ওয়াসা ভান্ডালজুড়ির পানি নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তারা নিজস্ব উৎপাদিত পানি ব্যবহার করছে। আবার কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) পানি নিচ্ছে না। বছরের বেশিরভাগ সময় গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকে সিইউএফএল সার কারখানা। তাই সিইউএফএলে ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী পানি নিলেও খুব বেশি আয়ের আশা করছে না ওয়াসা।
শোধনাগারের পানি ব্যবহার নিয়ে সিইউএফএলের মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) এস এম আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভান্ডালজুড়ি প্রকল্পের পানি আমরা নিচ্ছি না। আমাদের নিজস্ব উৎস থেকে নেওয়া পানি ব্যবহার করা হচ্ছে।
বছর বছর বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়
ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা অর্থ ব্যয় হয়। কর্ণফুলী নদীর তীরে বোয়ালখালী উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকায় এই প্রকল্পের অবস্থান। ৪০ দশমিক ১ একরজুড়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি একনেক সভায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ভূমি জটিলতার কারণে তিন বছর কাজ শুরু করা যায়নি। পরে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভান্ডালজুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। নির্মাণকাজ শেষে বাণিজ্যিকভাবে পানি সরবরাহ শুরু করা হয় গত বছরের মার্চ থেকে।
সমীক্ষা নিয়ে আছে প্রশ্ন
যেকোনো বড় প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার আগে সমীক্ষা করা হয়। সমীক্ষায় পরিচালন ব্যয় থেকে গ্রাহক পাওয়া সবকিছু যাচাই করা হয়। বিশেষ করে প্রকল্পটি লাভজনক হবে কি না তা খতিয়ে দেখা হয়। পরে প্রকল্পের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জানানো হয়। নগরীর মূল অংশ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে মফস্বল এলাকায় শোধনাগারটির অবস্থান। ওয়াসা বলছে স্থানীয় আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক গ্রাহকদের টার্গেট করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু শোধনাগার থেকে উৎপাদন শুরুর পর ১৯ মাস পার হয়ে গেছে। এখনও ব্যাপক গ্রাহক মেলেনি।
আবাসিক গ্রাহকরা বাড়িতে স্থাপন করা গভীর নলকূপ থেকে পানি নিতে আগ্রহী। ওয়াসা থেকে মাসিক বিলের মাধ্যমে পানি নিতে চান না। আবার বাণিজ্যিক গ্রাহকরাও প্রকল্পের পানি নিতে খুব বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছে না। ভান্ডালজুড়ি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের মাধ্যমে। ৮২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা অর্থায়ন করেছে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক। আগামী ২০২৯ সাল থেকে ঋণ কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা। মাঝখানে আছে দুবছর। কিন্তু শোধনাগারটি এখনও লাভের মুখ দেখেনি। উৎপাদন ক্ষমতার সমান গ্রাহক পায়নি। সব মিলে শোধনাগারটি অনেকটা শ্বেতহস্তিতে পরিণত হয়েছে।
ভরসা নগরমুখী পাইপলাইন
ভান্ডালজুড়ি শোধনাগার থেকে একটি পাইপলাইন এসেছে আনোয়ারা উপজেলা পর্যন্ত। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের পানি সরবরাহ করতে এই পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এই লাইনের সঙ্গে যুক্ত করে আরেকটি পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নগরীর পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর নগরীর বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ হবে। এরপর ভান্ডালজুড়ি শোধনাগারে থাকবে না গ্রাহক সংকট এমন প্রত্যাশা ওয়াসার। বর্তমানে নগরীতে ওয়াসার চারটি পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং ৪৯টি গভীর নলকূপ থেকে পানি সরবরাহ আসে। এগুলো হচ্ছে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১, কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-২, মোহরা পানি শোধনাগার ও মদুনাঘাট পানি শোধনাগার প্রকল্প।
পানি ব্যবহার না করেও বিল
আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলা, আনোয়ারা উপজেলা ও পটিয়া উপজেলাকে টার্গেট করা হয়েছিল। এসব এলাকার গ্রাহকদের কাছে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি লিটার পানি। বাকি ৪ কোটি লিটার বাণিজ্যিক গ্রাহকদের কাছে। কিন্তু মফস্বল এলাকায় গভীর নলকূপের ব্যাপক ব্যবহার, মাসিক বিল দিয়ে পানি নিতে অনীহাসহ নানা কারণে গ্রাহক বাড়েনি। যা গ্রাহক তৈরি হয়েছে তারা সেবা নিয়ে তেমন সন্তুষ্ট নন বলে অভিযোগ আছে।
ভান্ডালজুড়ির বোয়ালখালী পৌর এলাকার গ্রাহক সাইদুল ইসলাম বলেন, ওয়াসার পানির লাইন আছে আমার বাড়িতে। কিন্তু আমি পানি ব্যবহার করি না। অথচ আমাকে ২০ হাজার টাকার বিল পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি ওয়াসার সংশ্লিষ্টদের কাছে অবহিত করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আতা