প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৪২ পিএম
হাটহাজারীতে বিদ্যুৎ,জ্বালানি ছাড়া সেচ যন্ত্রের উদ্ভাবন। ছবি : সময়ের আলোবিদ্যুৎ কিংবা প্রচলিত জ্বালানি ছাড়াই জমিতে সেচ দেওয়ার স্বপ্ন থেকে শুরু হয়েছিল গবেষণা। দীর্ঘ ১২ বছরের প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিয়েছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ ফোরকান। উদ্ভাবন করেছেন জ্বালানিবিহীন পরিবেশবান্ধব এক সেচযন্ত্র। নিজের উদ্ভাবিত এ যন্ত্র ব্যবহার করে প্রায় ৪০০ কানি জমিতে চাষাবাদও করেছেন তিনি। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সম্ভাবনাময় এই উদ্ভাবন এখন থমকে যাওয়ার শঙ্কায়।
ফোরকান জানান, দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার একপর্যায়ে পাম্প মেশিনে পরিবর্তন এনে ব্যাটারির সাহায্যে সেটি চালানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। তার দাবি, এ পদ্ধতিতে প্রচলিত জ্বালানি ব্যবহার ছাড়াই জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। প্রায় ১২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টার পর উদ্ভাবিত যন্ত্রটি দিয়ে পশ্চিম বাথুয়া এলাকায় প্রায় ৪০০ কানি জমিতে চাষাবাদ করেন তিনি। এতে আর্থিকভাবেও লাভবান হয়েছেন বলে জানান ফোরকান। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শুরু হওয়া স্বপ্নের বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা।
মোহাম্মদ ফোরকান হাটহাজারী উপজেলার খন্দকিয়া ভুলিয়া পাড়ার মরহুম আহামদুল হক ও সায়েরা খাতুনের দ্বিতীয় ছেলে। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর কর্মসংস্থানের তাগিদে ১৯৯০ সালে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমান ফোরকান। সেখানে প্রায় ১৫ বছর অবস্থানের পর ২০০৬ সালের শুরুর দিকে জন্মভূমির টানে দেশে ফিরে আসেন। এরপর নিজেকে কৃষিকাজে নিয়োজিত করেন। কৃষিকাজ করতে গিয়ে সেচের জন্য ব্যবহৃত পাম্পের জ্বালানি খরচ তাকে ভাবিয়ে তোলে। উৎপাদন খরচের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছিল সেচের জ্বালানি বাবদ। এতে কৃষকের লাভ কমে যাওয়ার বিষয়টি তাকে নতুন কিছু করার চিন্তা জোগায়। কীভাবে জ্বালানি খরচ ছাড়াই জমিতে পানি সরবরাহ করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তার গবেষণা।
ফোরকানের উদ্ভাবিত সেচযন্ত্রটি ইতিমধ্যে হাটহাজারী উপজেলার সাবেক কয়েকজন নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। তারা যন্ত্রটির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করে ফোরকানকে গবেষণা অব্যাহত রাখার অনুপ্রেরণা দেন। দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এমন উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।
ফোরকান জানান, এই উদ্ভাবনকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে নিজের সঞ্চিত অর্থ ও সহায়-সম্বল অনেকটাই হারিয়েছেন তিনি। তবু থেমে যেতে চান না। তার দাবি, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সহযোগিতা পেলে সেচযন্ত্রটিকে আরও আধুনিক করা সম্ভব। এমনকি উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি থেকে ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন কারিগরি যাচাই, গবেষণা এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা।
শুধু কৃষি উদ্ভাবনেই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও রয়েছে ফোরকানের অবদান। বাড়ির পূর্ব পাশে পশ্চিম বাথুয়া লালাচন্দ্র বিলে কৃষিকাজের পাশাপাশি জমির পাশের খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণ করেন তিনি। গাছের সঠিক পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে পরিবেশ অধিদফতর তাকে জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। পরের বছর ২০১৬ সালে বৃক্ষরোপণে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
সময়ের আলো/আতা